পঁচিশ-ত্রিশ বছর আগে পীরদের মহা প্রতাপ ছিল বাংলাদেশে।
দেশের রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে অনেক রাজনীতিবিদ, জেনারেল ও ক্ষমতাশালী লোক ছুটে যেতেন পীরদের দরবারে। বাংলাদেশে এসে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোও অখ্যাত এক পীর মজিবর রহমান চিশতির কাছে ছুটে গিয়েছিলেন। সারা দেশে তুমুল আলোচিত ছিল এ ঘটনা। যুগ যুগ ধরে মানুষের অশিক্ষা, অসহায়ত্ব আর অন্ধবিশ্বাসকে পুঁজি করে বাংলাদেশে চলছে ভণ্ড পীরদের দৌরাত্ম্য।
আমাদের দেশে সাধারণত দুই ধরনের পীরেরা আছে । রাজনৈতিক পীর আর ব্যবসায়ী পীর। রাজনৈতিক পীরেরা ধর্মব্যবসার পাশাপাশি রাজনীতিবিদ আর ক্ষমতাধর মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। রাজনৈতিক পীরদের মধ্যে একসময় সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ছিলেন ফরিদপুর নিবাসী আটরশির পীর। এরশাদের কল্যাণে তিনি তখন তারকাখ্যাতি পেয়েছিলেন বাংলাদেশে। আটরশির পীরের কাছে যাওয়ার ‘সৌভাগ্য’ বা ‘দুর্ভাগ্য’ আমার কোনটিই হয়নি । লোক মুখে তার অনেক কিচ্ছা কাহিনী শুনেছি ।
আটরশীর পীর বলতে ফরিদপুর শহরের নিকটস্থ আটরশী বিশ্বজাকের মঞ্জিলের প্রতিষ্ঠাতা শাহসুফি হাশমত উল্লাহ। তিনি এনায়েতপুরের পীর শাহসূফী মোহাম্মদ ইউনুস আলী এনায়েতপুরীর মুরীদ ও খলীফা।জনাব হাশমত সাহেব জামালপুর জেলার শেরপুর থানার পাকুরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন।তার পিতা শাহ আলিম উদ্দিন।হাশমত উল্লাহ সাহেবের বয়স যখন ৫/৬ বছর তখন তিনি নোয়াখালির মাওলানা শরাফত আলীর নিকট আরবি,ফার্সি প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন (আর ইহাকেই বলে অল্প বিদ্যায় ভয়ংকরী) ।এতটুকুই তার পড়াশুনার ইতিহাস পাওয়া যায় ।
দশ বছর বয়সের সময় তার পিতা তাকে এনায়েতপুরির পীর ইউনুস আলীর খেদমতে অর্পণ করেন।ত্রিশ বছর যাবত তিনি এনায়েতপুরি সাহেবের কাছে থাকেন।অতএব এনায়েতপুরির নির্দেশে ফরিদপুরে এসে তিনি জাকের ক্যাম্প নামে একটি ক্যাম্প স্থাপন করেন।পরবর্তী কালে এটারই নাম দেওয়া হয় “বিশ্ব জাকের মঞ্জিল”।
ধর্মভিত্তিক রাজনীতির চেয়ে আরো ভয়াবহ ধর্ম ব্যবসা আমাদের দেশে চলছে পীর ব্যবসা ও মাজার ব্যবসার । অবৈধ পীর ব্যবসা ও মাজার ব্যবসার মাধ্যমে ধর্মব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ধর্মান্ধ লোকজনের কাছ থেকে । পীর বাবারা ওরশ করার নামে বিপুল পরিমাণ দান হাতিয়ে নিচ্ছেন । জশনে জুলুস নামে একটা বেদআত রীতিও পালন করছে কোন কোন পীর।
এই সকল তথাকথিত পীরদের মৃত্যুর পর নতুন করে চালু হয়েছে গদ্দিনশীন পীর নামে আরেকটি ভয়াবহ প্রথা । কোন যোগ্যতা ছাড়াই পীরের ছেলে পীর হয়ে যাচ্ছেন ! ডাক্তারের ছেলে মেডিক্যালে পড়া ছাড়া ডাক্তার হয় না, ইঞ্জিনিয়ারের ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া ছাড়া ইঞ্জিনিয়ার হয় না। মাওলানার ছেলে মাদ্রাসায় না পড়ে মাওলানা হয় না। কিন্তু পীরের ছেলে বলেই একজন পীর হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন ! মূলত আয়ের এই সহজ রাস্তা ছাড়তে চায় না বলেই পীরেরা এই গদ্দিনশীন পীর ব্যবস্থা তৈরি করেছেন।
পীর শব্দটি ফার্সি। আরবীতে বলা হয় মুরশীদ। মুরশীদ শব্দের অর্থ হল পথপ্রদর্শক। যিনি আল্লাহর আদেশ নিষেধ আল্লাহ তা’আলা যেভাবে চান সেভাবে পালন করার প্রশিক্ষণ দেন তার নাম মুরশীদ বা পথপ্রদর্শক। যাকে ফার্সীতে বলে পীর।
বর্তমানে ইহুদী নাসারারা যতটা না ভয়ংকর এই পীর নামধারী ভন্ডগুলি ইসলামের জন্য আরো ভয়ংকর হয়ে দেখা দিয়েছে।
এই সকল ভন্ড পীরেরা আবার বিভিন্ন তরিকায় বিভক্ত। কাদেরিয়া, চিশ্তিয়া, সাবেরিয়া, নকশিবন্দি, মোজাদ্দেদিয়া একেক তরিকায় একেক পীর । এই পীরেরা নাকি ইবাদত করতে করতে আল্লাহর সাথে মিশে যায় তখন আর তাদের ইবাদত করতে হয় না । অনেকে দাবি করে জীব্রাইল (আঃ) নাকি ঘুমের মধ্যে এদের কাছে কাবাঘর নিয়ে আসে, সে বসে বসে তাওয়াফ করেন (নাউজুবিল্লাহ)।
মাহবুব এ খোদা,সুফী সম্রাট,ভণ্ড পীর দেওয়ানবাগী সেনাবাহিনীর ১৫ নং বেঙ্গল রেজিমেন্টে ইমামতির চাকুরী করতেন ।ফরিদপুরের চন্দ্রপাড়া দরবারের প্রতিষ্ঠাতা আবুল ফজল সুলতান আহমদ চন্দ্রপুরীর হাতে বাইয়াত গ্রহন করেন। পরে স্বীয় মুর্শিদের কন্যা হামিদা বেগমকে বিয়ে করেন। এ সুবাদে শশুরের কাছ থেকে খিলাফত লাভ করেন। নিজেকে “সুফী সম্রাট” হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। এই ভণ্ড প্রতারক দাবি করে, শুধু আমি নই, আমার স্ত্রী কন্যা সহ লক্ষ্য লক্ষ্য মুরিদানও আল্লাহকে দেখেছেন”। “দেওয়ানবাগে আল্লাহ ও সমস্ত নবী রাসূল, ফেরেস্তারা মিছিল করে এবং আল্লাহ নিজে শ্লোগান দেন”(নাউজুবিল্লাহ)। এই ধরণের অসংখ্য ভণ্ড প্রতারক নিজেদেরকে পীর দাবী করে শুধু অন্ধবিশ্বাসী মানুষ নয় আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসুলের সাথে প্রতারণা করছেন।
“মুরীদ” শব্দটিও আরবী। যার অর্থ হল ইচ্ছাপোষণকারী। যে ব্যক্তি আল্লাহর আদেশ নিষেধ আল্লাহ তা’আলা যেভাবে চান সেভাবে পালন করার ইচ্ছা পোষণ করে কোন বুযুর্গ ব্যক্তির হাত ধরে শপথ করে, সে ব্যক্তির নাম হল “মুরীদ”।
কিন্তু কথা হচ্ছে যার অনুসরণ করা হবে সে অবশ্যই সীরাতে মুস্তাকিমের পথিক হতে হবে। আখেরাতে নাজাত পাওয়ার জন্য মুরীদ হওয়া জরুরী নয়। বেদআতি, ভণ্ড, মাজারপূজারী, বেপর্দা পীরের কাছে মুরিদ হলে ঈমানহারা হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে।। বিশেষ করে আটরশী, দেওয়ানবাগী, কুতুববাগী, চরমনাই , মাইজভান্ডারী, রাজারবাগী, ফুলতলী, মানিকগঞ্জী, কেল্লাবাবা ইত্যাদী পীর সাহেবের দরবারে গেলে ঈমানহারা হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
পবিত্র কুরআন শরীফের বলা হয়েছে,
“কেউ কারও পাপের বোঝা বহন করবে না”। স্বয়ং নবী করীম (সাঃ) তার গোত্রের লোক বনু হাশিম,বনু মুত্তালিব সহ নিজ কন্যা ফাতেমাকে পর্যন্ত আহবান করে বলেছেন,তোমরা নিজেদের নাজাতের ব্যবস্থা নিজেরা কর ,আমি তোমাদের রক্ষা করতে পারব না। কাজেই পীর ধরলেই মুক্তি হবে এমন ধারণা চরম গোমরাহী মূলক আকীদা।তবে হাক্কানী পীর মাশায়েখের হেদায়েত মেনে চললে ফায়দা অবশ্যই রয়েছে সেটা ভিন্ন কথা।পীর তালিম দিয়ে বা কোনভাবে মুরীদের নাজাতের ব্যবস্থা করতে পারবে এ ধারণা ভ্রান্ত।কেউ নিজে আমল করে নাজাতের ব্যবস্থা না করলে কোন পীর তাকে নাজাত দিতে পারবে না।
