(লেখাটি সাধারণ কোন স্ট্যাটাস নয় । আমার ঘটনা বহুল জীবনের খন্ডিত জীবন কাহিনী মাত্র)

জীবনে কখনো কখনো বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া খুব কঠিন।বাস্তবতা প্রকৃতির মত পরিবর্তনশীল।এতে কখনো সুখের ছোঁয়া আসে,কখনো হয়ে যায় দুঃখময় । বস্তাবতাকে মানিয়ে নেয়ার অভ্যাস নিজ থেকে চলে আসে, একে মেনে নিতে হয় । অনেকের মুখে শুনেছি মানুষের জীবনে ৮০% বাস্তবতা আর ২০% আবেগ নাকি খুব বেশি জরুরী।জীবনের বাস্তবতার বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, যতই নিষ্ঠুর হউক বা যতই কষ্টের হউক তা সয়ে নিতে হয়, মেনে নিতে হয় জীবনের প্রয়োজনেই। জীবনে কষ্ট আসলে মানসিক ভাকে যতটুকু ভেঙ্গে পড়বে জীবন তার দ্বিগুন পিছিয়ে যাবে। জীবনের সকল দূঃখ কষ্ট ও বাস্তবতাকে জীবনের অংশ হিসাবে মেনে নিয়ে স্বাভাবিক ভাবে গ্রহন করার নামই হচ্ছে সুখ।আর জীবনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে , সে কখনও এক পথে চলেনা। মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী চলেনা। কষ্ট কখনো কখনো এমন ভাবে আসে যখন চোখ বন্ধ হয়ে যায়। কান বধির হয়ে যায়।কন্ঠ বোবা হয়ে যায়। বুদ্ধি নির্বোধ হয়ে যায়। শরীর পঙ্গু হয়ে যায়। দিশেহারা জীবনে সব পরিকল্পনা ছাড়খার হয়ে যায়। তারপরও মানুষকে বেঁচে থাকতে হয় জীবনের অদৃশ্য প্রয়োজনে। আমি জানিনা কি সে প্রয়োজন? জীবনের কোথায় যেন কিসের একটা অদৃশ্য টান। আমার অনুপস্থিতিতে সব চলছে যথারীতি। তারপরও মনে হয় আমিই যেন সব সমস্যা সমাধানের একমাত্র ভরষা। মনে হয়, আমি ছাড়া সমস্যা সমাধানের আর কেউ নাই, আমাকে ছাড়া ? অসম্ভব ! এই মনে হয় বলেই হয়তো হাজার যন্ত্রনা সয়ে বেঁচে আছি !! কিছু অভিজ্ঞতা থেকে এখন বারবার মনে হয় –চলমান সময় যত কষ্টেরই হোক, পরবর্তীতে যদি সাফল্য পাওয়া যায়, তখন আগের কষ্টের কথা মনে থাকে না। কিছু বিষয় আছে যেগুলো ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। কত কঠিন সময় যে মানুষের জীবনে আসে, যার শতভাগের একভাগ অন্য কোন মানুষ অনুভব করতে পারে না, কেবল যিনি ভুগছেন, তিনিই বুঝেন।
আজ আমার জীবনের কিছু ঘটনাবলী এবং কিছু মানুষের সরব উপস্থিতি,তাদের আন্তরিকতা, আমার প্রতি তাদের অকৃত্রিম ভালবাসার কথা কেন জানি বারবার মনে পড়ছে । আমার এই লেখা অনেকের কাছে হয়তো উদ্ভট অলীক কাহিনী মনে হতে পারে ! কিন্তু সত্যি বলছি এই কাহিনী আমার জীবনের একটি অধ্যায় । এখানে বিন্দুমাত্র মিথ্যার লেশ নাই ।
২৮ এপ্রিল ২০১৭ দশ বছর আগে ২০০৭ সালের এই দিনে বিপুল আশা এবং উদ্দীপনা নিয়ে ইউরোপের পথে আমার যাত্রা । জীবনে কখনো, জীবন এবং জীবিকার তাগিদে প্রবাসে এসে থাকতে হবে তা ছিলো আমার কল্পনাতীত । কিন্তু কিছুটা নিজের অনিয়ন্ত্রিত এবং অমিতব্যয়ী জীবন যাপনের কারণে অবার কিছুটা ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে অনেকটা বাধ্য হয়ে বিদেশে আগমন । যাক এই প্রসঙ্গে পরে আলোচনা করবো । জানিনা কেন জানি এই এপ্রিল মাসটা আমার জীবনের অনেক পালাবদলের সাথে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে আছে ! কাকতালীয় ভাবে আমার জীবনে যত গুলি কাজে হাত দিয়েছি তার অধিকাংশই এপ্রিল মাসে ! ১৯৮৯ সালের শুরুর দিকে কিছু একটা করার চিন্তা মাথায় আসলো । কিন্তু কি করবো ঠিক করতে পারছিলাম না । বেশী ভাবাভাবি না করে অবশেষে স্থীর করলাম ঔষধের ব্যবসা করার ।পূর্বকোন অভিজ্ঞতা নাই, কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসাও বটে তারপরও সাহস করে নতুন ব্যবসায় হাত দিলাম । জীবনের প্রথম ব্যবসা শুরু করলাম ৮৯এর এপ্রিল মাস থেকে । ভালোই চলছিলো ব্যবসা । কিন্তু তিন বছরের মধ্যে আমি কেমন জানি হাঁফিয়ে উঠেছি । সরাক্ষণ বসে বসে ব্যবসা করতে ভালো লাগছিল না । কোন ভাবেই ঔষধ ব্যবসায় মন বসাতে পারছিলাম না । নতুন কিছু করার জন্য ছটফট করতে লাগলাম । এরেই মধ্যে সড়ক ও জনপদ বিভাগে ঠিকাদারির একটা লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে ফেললাম। মনে মনে স্থীর করলাম ঠিকাদারি ব্যবসাই করবো । কুমিল্লা সড়ক সার্কেল অফিস থেকে নতুন লাইসেন্স নিয়ে নোয়াখালী ফিরে আসার পথে জানতে পারলাম পররের দিন নোয়াখালী সড়ক বিভাগে টেন্ডার আছে আজই সিডিউল বিক্রির শেষ দিন । কুমিল্লা থেকে ফিরে আসতে আসতে রাত প্রায় ৮টা বেজে গেল । বাস থেকে নেমে সোজা সড়ক ভবনে চলে গেলাম । ক্যাশিয়ার বসে বসে সারা দিনের সিডিউল বিক্রির হিসাব নিয়ে কাজ করছিলো । বিকেল ৫টায় সিডিউল বিক্রির শেষ সময় । আমি রাত ৮টায় ক্যাশিয়ারকে অনুরোধ করলাম আমাকে দুটি সিডিউল দেওয়ার জন্য ! ক্যাশিয়ার ছিলো একজন হিন্দু ভদ্রলোক । আমার ঔষধ দোকানের সুবাধে কিছুটা পূর্ব পরিচয় ছিলো । কিন্তু এই সামান্য পরিচয়ে ভদ্রলোক কিছুতেই সময় অতিক্রমের পর সিডিউল বিক্রি করতে সম্মত হচ্ছিল না । আমিও নাছোড়বান্দা কিছুতেই তার পিছন ছাড়ছি না । অনেক পীড়াপীড়ির পর ক্যাশিয়ার সিডিউল দিতে সম্মত হলো , কিন্তু শর্ত হলো কোন অবস্থাতেই অফিসে সিডিউল দেওয়া যাবে না রাত ১১টার পর আমার দোকানে দিয়ে আসবে । ভদ্রলোকের কাছে আমি কৃতজ্ঞ কথামত আমাকে দুটি সিডিউল দিয়েছেন। অনেক পীড়াপীড়ী করেও সিডিউলের নির্ধারিত মুল্যের অতিরিক্ত কোন টাকা ভদ্রলোককে দিতে পারিনি । অনেক রাত পর্যন্ত পূর্ব পরিচিত একজন ঠিকাদারের সহযোগিতায় সিডিউল পূরণ করে সকালে যথা সময়ে আমার জীবনের প্রথম ঠিকাদারি কাজের সিডিউল টেন্ডার বক্সে ফেলে এলাম। আশ্চর্যজনক হলোও সত্যি মাসটি ছিলো এপ্রিল মাস। সম্ভবত ৫দিন পর কুমিল্লা সড়ক সার্কেল অফিসে লটারী অনুষ্ঠিত হলো । আমি কাজ পাওয়ার ব্যাপারে তেমন আশাবাদী ছিলাম না,তাই কষ্ট করে কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত লটারীতে নিজে গেলাম না । বিকালে লটারীর খবর সংগ্রহ করার জন্য নোয়াখালী সড়ক ও জনপদ অফিসে গিয়ে জানতে পারলাম একটি মাত্র কাজ নোয়াখালীর কোন একজন ঠিকাদার পেয়েছে কিন্তু কেউ ঐ ঠিকাদারকে চেনেনা। আমি কুমিল্লা ফেরৎ একজন পরিচিত ঠিকাদারকে জিজ্ঞেস করলাম কাজ পাওয়া ঐ ফার্মে নাম কি ? আমার প্রতিষ্ঠানের নাম ভালো ভাবে বলতে না পারলেও যতটুকু বুঝতে পেরেছি কাজটি আমিই পেয়েছি ।বিলম্ব না করে একটি মাইক্রো নিয়ে পরিচিত দুজন ঠিকাদার সহ তখনই কুমিল্লার পথে যাত্রা শুরু করলাম।কুমিল্লা সড়ক ভবনে এসে নিশ্চিত হলাম কাজটি আমি পেয়েছি । শুরু হলো জীবনের নতুন আরেকটি অধ্যায়ের । কাজটি তেমন বড় ছিলনা ঠিক কিন্তু প্রথম অংশ গ্রহণে সাফল্য আসায় পূর্ণোদ্যমে লেগে গেলাম । নোয়াখালী,লক্ষীপুর, ফেনী সড়ক বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়ন মূলক কাজের টেন্ডারে অংশ গ্রহণ করতে শুরু করলাম । ধীরে ধীরে আরো সাফল্য আসতে শুরু করলো । একের পর এক কাজের সংখ্যা বৃদ্ধি ফেতে লাগলো ।আমিও কিছুটা উচ্চবিলাসী এবং বেপরোয়া হয়ে ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধি করে সড়ক ও জনপথ বিভাগের বাহিরে অন্যান্য দপ্তরে লাইসেন্স করতে শুরু করলাম । ফ্যাসিলিটিজ ,এলজিইডি , পাবলিক হেলথ,নোয়াখালী পৌরসভা,সহ অন্যান্য দপ্তরের দরপত্রে অংশ গ্রহণ করে সেখানেও সাফল্য পেতে শুরু করলাম । বিভিন্ন দপ্তরের চুক্তিবদ্ধ কাজ গুলি সুচারু রূপে সময়মত শেষ করতে চেষ্টা করছি ,এতে করে সব দপ্তরে আমার আলাদা একটা সুনাম বৃদ্ধি পেতে লাগলো ।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে গিয়ে দু’জন মানুষ আমাকে বিষম ভাবে অনুপ্রাণিত করেছে ।কারো সাথেই আমার পূর্ব পরিচয় ছিলো না । কিন্তু কি ভাব যে এরা আমার জীবনের সাথে মিশে গেছে আমি নিজেও জানিনা । জসিম উদ্দিন, ছেলেটির বাড়ি চট্রগ্রাম । ইউসিবিএল ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার হিসাবে নোয়াখালীতে আসে । দেখতে গোলগাল টাক মাথার ফর্সা ফুটফুটে অল্প বয়সের একটি ছেলে।আমার দোকানের পাশেই ছিল ইউসিবিএল ব্যাংক । টাকা লেনদেনের জন্য ব্যাংকে গেলে বা রাস্তায় আমার চোখের সামনে পড়লে আমি টিপ্পনি কাটতাম । টিপ্পনির ভয়ে সব সময় আমাকে দেখলে এড়িয়ে চলতো।মনে হয় অসহ্য হয়ে শুধু শুধু একটা সিভিট বা এ্যান্টাসিড ট্যাবলেট ক্রয়ের অজুহাতে দোকানে আসতে থাকে । আমি সামনে কিছু না বললেও যাওয়ার পথে ঠিকই কিছু না কিছু বলে মন্তব্য করতাম । ধীরে ধীরে কি ভাবে যে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্টতা গড়ে উঠে।বন্ধু মানে আত্মার আত্মীয়,যে আত্মীয়তা কখনো কখনো রক্তের বন্ধনকেও ছাড়িয়ে যায়। প্রকৃত বন্ধু হচ্ছে সেই যে সুখের সময় যেমন হাসিমুখে পাশে থাকে, তেমনি দুঃখের দিন গুলোতেও লড়াইয়ে সাহস জোগায় । কিছুদিনের মধ্যে ও হয়ে যায় আমার সর্বক্ষণের সাথী । অত্যন্ত বিশ্বাসী এবং হিতকারী একজন মানুষ । আমার আপদ বিপদে সাবার আগে তাকে কাছে পেয়েছি । যখন যা কিছুর প্রয়োজন হয়েছে অনেক সময় সাধ্যের বাহিরে হলেও আমার জন্য চেষ্টা করেছে । কাজ শেষ করে যত রাতই হোক তার সাথে একবার দেখা করতাম । ঘনিষ্ঠতা হওয়ার পর আমি কখনো ব্যাংকে লেনদেনের চেকবই আমার কাছে রাখতাম না ।নিজে কখনো চেকবই লেখতাম না । ব্লাঙ্ক চেকবই সই করে তার কাছে রেখে দিতাম । যখন যত টাকার প্রয়োজন হয়েছে আমার একাউন্টে টাকা থাকুক আর না থাকুক আমার যত টাকার প্রয়োজন হোক সেই ব্যবস্থা করে দিয়েছে ।বিনিময়ে কখনো কিছু আশা করেনি । আপন ভাইয়ের মত সব সময় আমার পাশে থেকেছে । তার সুবাধে সম্পর্ক গড়ে উঠে ব্যাংক ম্যানেজার চন্দন সেনের সাথে । এই ভদ্রলোক যতদিন নোয়াখালী ব্রাঞ্চে কর্মরত ছিলেন অকৃত্রিম ভাবে আমাকে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন । শুধু আমাকে নয় তখনকার সময়ে আমাদের অনেক ঠিকাদার বন্ধুকে তিনি সাহায্য করতে দেখেছি।ডেকে এনে কারো সিডিআর বা ব্যাংক ড্রাফটের প্রয়োজন হলে নিজের একাউন্ট থেকে টাকা দিয়ে সহযোগিতা করতে দেখেছি। আমি নিজেও বড় কোন টেন্ডারে অংশ নিতে সিডিআর বা ব্যংক ড্রাফটের প্রয়োজন হলে তাঁর কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছি বা নগদ টাকার বিশেষ প্রয়োজন হলেও তিনি কখনো নিষেধ করেননি । ক্ষুদ্র জীবনে এই সকল মানুষের সান্নিধ্য লাভ আমার জীবনে উৎকর্ষ সাধনে অপরিসীম ভূমিকা আছে। ইচ্ছা করলেই এদের অবদান বা স্পর্শানুভূতির কথা কখনো ভুলতে পারিনা। সাফল্য যখন হাতের মুঠে ধরা দিতে লাগলো দুর্ভাগ্য এবার পিছু নিলো ।
১৯৯৭ সালে নোয়াখালী এলজিইডির অধিন সোনাপুর – আখতারমিয়ার হাট সড়ক উন্নয়নের একটি কাজের দরপত্রে অংশ গ্রহণ করলাম । যথারিতি কাজটি পেলামও বটে । ৩০ কিঃমিঃ দৈর্ঘ্য সড়কটি ৩কিঃমিঃ করে ১০ গ্রুপে দরপত্র আহ্বান করা হয় । প্রতিটি গ্রুপের প্রাক্কলিত মূল্য ছিলো ৫৫লক্ষ টাকার কিছু বেশি । কাজটির ধরণ বা নির্মাণ পদ্ধতি ছিলো কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির । মাটি, বালি, খোয়ার সংমিশ্রণে বেজমেন্ট প্রস্তুত করে সড়ক পাকা করণের কাজ যার সংক্ষিপ্ত নাম এএসএস ASS ভিন্ন অর্থে (গাধা), আরেকটি অর্থ আছে যা অপ্রকাশ্য থাকাই শ্রেয়। স্বল্প ব্যয়ে গ্রামীন সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের নামে সরকার তথা জনগণের অর্থ অপচয়ের একটি প্রকল্প । কিছু না বুঝেও কাজটি শুরু করার প্রস্তুতি নিলাম যথা সময়ে । সড়ক নির্মাণের প্রয়োজনীয় ইট বালু সহ অন্যান্য মালামাল নিতে শুরু করলাম । সড়কটি খুবই দুর্গম এলাকায়, যাতায়ত ব্যবস্থা ছিলো আরো করুণ । গাজীর খেয়া স্থানীয় ভাবে (গাইজ্জার খেবা নামে) পরিচিত খালের উপর কোন ব্রীজ কালভাট ছিলোনা । শুস্ক মৌসুমে খালের মধ্যে বাঁধ দিয়ে বিকল্প সড়কে সল্প পরিসরে কিছু গাড়ী চলাচল করতো মাত্র। আমরা ১০জন ঠিকাদারের মধ্যে আমিই প্রথম কাজটি শুরু করার উদ্যোগ গ্রহণ করি । বিশ্বাস করবেন কিনা দৈবক্রমে মাসটি ছিলো এপ্রিল মাস । বর্যা মৌসুম শুরুর আগে কাজটি শুরু করলাম । প্রায় ১কিঃমিঃ রাস্তার বেজমেন্ট শেষ করতে না করতে বর্ষা শুরু হয়ে গেল । সড়ক যাতায়তে অনুপযোগী হয়ে পড়ায় সড়কের পাশে সমস্ত মালামাল রেখে কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলাম । একটি বছর সড়কের পাশে ফেলে রাখা আমার ইট বালির অধিকাংশ বেহাত হয়ে যায় । সড়কের পাশে বাড়ির মানুষ গুলি বিক্ষিপ্ত ভাবে পড়ে থাকা ইট বালি দিয়ে ঘরের ভিটি পাকা থেকে শুরু করে পুকুর ঘাট পাক করতে শুরু করে । স্থানীয় একজন লোককে পাহারাদার হিসাবে রেখে আসি। পরে খবর নিয়ে জানতে পারি ঐ পাহারাদার সড়কের ইট বালি দিয়ে নিজ বাড়িতে সেমিপাকা একটি ঘর তৈরী করেছে । যাক শুস্ক মৌসুমে পরবর্তী বছর আবার কাজ শুরু করলাম । আমার হাতে তখন নোয়াখালী সড়ক বিভাগের অধীনে বেগমগঞ্জ- চাটখিল – রামগঞ্জ সড়ক মেরামতের একটি কাজ, ফেনী সড়ক বিভাগের অধীনে একটি সড়ক মেরামতের কাজ এবং ফ্যাসিলিটিজ ডিপাটমেন্টের অধিনে মাইজদিতে তিনতলা বিশিষ্ট একটি স্কুল ভবন নির্মাণের কাজ । যাতায়ত ব্যবস্থা দুর্গম হওয়ায় এবং ফেনী চাটখিলের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এলজিইডির কাজে খুব একটা সময় দিতে পারছিলাম না । কাজ দেখা শুনার জন্য আমার বড় ভাইকে দায়িত্ব দিলাম । কাজটি যেই গতিতে চলার কথা প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ করার পরও প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল পাচ্ছিলাম না । কাজটি নিয়ে আমি কিছুটা হতাশ হয়ে পড়লাম । আর কাজটি করতে গিয়ে আমি যেই মারাত্মক ভুল করেছিলাম তাহলো কাজ চলাকালীন কোন চলতি বিল না নেওয়া । সময়ের অভাবে বিল করবো করবো চিন্তা করেও বিল করা হয়নি । যার ফলে এমবি তে(মেজারমেন্ট বুক) কোন রেকর্ড ছিলোনা । মাথায় চিন্তা ছিলো পুরো কাজ শেষ করে এক সাথে ফাইনাল বিল করবো । বিধিবাম পরবর্তীতে সেইটাই আমার জন্য কাল হলো । কাজটি শেষ হওয়ার দু তিন দিন আগে আবারো এপ্রিল মাস আমার সামনে অন্তরায় হয়ে আসলো । কালবৈশাখীর ঝড়ের কারণে তিনদিন কাজটি বন্ধ রাখতে বাধ্য হই । কার্পেটিং এর কাজ চলাকালে ঝড় বৃষ্টি হলে কাজ করা সম্ভব হয় না । বৃষ্টির পর কাজ যখন শুরু করলাম শেষ দিনে সাত আটশ ফুট কাজ বাকি রেখে আবার কাজ বন্ধ করে দিতে হলো । কারণ ঐ জয়গাটায় ছিলো একটি বাজার । সাপ্তাহিক বাজারের কারণে কাজ করা সম্ভব হয়নি ।
ইচ্ছা ছিলো রাতে কাজ করে হলেও কাজটি সেইদিনই শেষ করে ফেলবো । লেবারদের সাথে সেই ভাবে আলাপও করে রেখে ছিলাম। সন্ধ্যার পর থেকে মুশুলধারে বৃষ্টি আরম্ভ হলো । কয়েক দিন পর্যন্ত অবিরাম বৃষ্টি শুরু হলো, বন্ধ হওয়ার কোন লক্ষণ নাই । লেবাররা দশ দিন অপেক্ষা করে সাইড ত্যাগ করে চলে গেল । একটানা বৃষ্টি আর চরাঞ্চলে সাগরের জোয়ারে নির্মাণধীন সড়ক পানির নীচে তলিয়ে গেল। শুরু হয়ে গেল ৯৮ ভয়াবহ বন্যা । ৩ কিঃমিঃ সড়কের মধ্যে প্রায় দুই কিঃমিঃ সড়কের বিভিন্ন স্থানে দুই থেকে তিন ফুট পানির নীচে তলিয়ে যায় । স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার পর যখন সড়ক থেকে পানি সরতে শুরু করলো অধিকাংশ স্থানে পাকা রাস্তার কোন অস্তিত্ব চোখে পড়লো না । ইটের কণা,পাথর কুচি আর বিটুমিনের সাথে কাদাজলে মিশে একাকার । এলজিইডির বিভিন্ন স্তরের প্রকৌশলীরা সমস্ত সড়ক পর্যবেক্ষণ করে কোন সিদ্ধান্ত দিতে অপারগতা প্রকাশ করছে । ৩০ কিঃমিঃ সড়কের ২০কিঃমিঃ সড়ক মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । অবিশিষ্ট অংশেরও কম বেশী ক্ষতি হয়েছে । আমি ছাড়া অন্যান্য ঠিকাদাররা চলতি বিল গ্রহণ করায় কিছুটা সুবিধা জনক অবস্থানে ছিলো । অনেকেই ফাইনাল বিল জমা দিয়েছে । আমার মত মহা বিপদে আর কেউ পড়েনি । অনেক চেষ্টা তদবীর করেও এসও(সেকশন অফিসার) কে দিয়ে এমবিতে বিল এন্টি করাতে পারনি । অপ্রত্যাশিত এই ঝামেলায় পড়ে আমি মানসিক ভাবে খুবই ভেঙ্গে পড়লাম । অপরাপর কাজ গুলি সঠিক ভাবে দেখা শুনা করতে পারছি না । নতুন করে কোন টেন্ডারে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকলাম। এলজিইডির বিলের পিছনে সারাক্ষণ ছুটোছুটি করতে করতে বাকি কাজ গুলি প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম ।নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন কাজই শেষ করতে পারি নাই । ফলে কাজের ব্যয় বৃদ্ধি পেতে লাগলো । আমি যখন কিছুটা উদভ্রান্ত এবং অস্থীর ভাবে বিল নিয়ে ছুটোছুটি করছি তখন কয়েক জন হিতৈষী বন্ধু আমাকে সহযোগিতার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন । এদের মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য নোয়াখালী পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম রবিউল হোসেন কচি ভাই ।হাতিয়া উপজেলার সাবেক সংসদ সদস্য জনাব ফজলে আজিম । নোয়াখালী জেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলমগীর আলো,ছাত্রদল নোয়াখালী জেলা শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহীন ।জনাব রবিউল হোসেন কচি ভাই আজ বেঁচে নাই । তিনি ছিলেন আমার শ্রদ্ধাস্পদ একজন বড় ভাই । আমাকে খুব স্নেহ করতেন । আমি কখনো তাঁহার কাছে সাহায্য চাইতে যাই নাই । আমাকে বেশ কিছুদিন না দেখে আমার চাচা বিশিষ্ট সাংবাদিক জনাব নুরুল আমিনকে আমার খবরা খবর জানতে চাইলেন । চাচা সম্ভবত আমার ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার কাহিনী তাহাকে বলেছেন । কচি ভাই আমাকে একদিন তার সাথে দুপুরের খাবার খাওয়ার দাওয়াত দিলেন । আমি খবর পেয়ে উনার সাথে দেখা করতে গেলাম । আমাকে দেখে খুব আন্তরিক ভাবে সম্ভাষণ জানিয়ে পাশে বসালেন । কিছুক্ষণ পর আমাকে নিয়ে চলে গেলেন পাশের কামরায়,দুজনের জন্য দুপুরের খাবার আনতে পিয়নকে পাঠিয়ে দিলেন । দুপুরের খাবার খেতে খেতে আমার দুর্দশার কথা তাকে খুলে বললাম । আমাকে সান্তনা দিয়ে ধৈর্য ধারণ করার পরামর্শ দিলেন । এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী জনাব কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সাথে আমাকে নিয়ে দেখা করার প্রতিশ্রুতি দিলেন । পরবর্তী সপ্তাহে ঢাকা যাওয়ার সময় আমাকে সাথে নিয়ে ঢাকা গলেন । যথারিতি প্রধান প্রকৌশলীর সাথে দুজনে দেখাও করলাম।জনাব কামরুল ইসলাম বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বস্ত করলেন । কিন্তু দুই মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও চীফ ইঞ্জিনিয়ারের অফিস থেকে কোন সিদ্ধান্ত আসে নাই । লোকমুখে জানতে পারলাম হাতিয়ার সংসদ সদস্য জনাব ফজলুল আজিম সাহেব প্রধান প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর ভালো বন্ধু । শিক্ষা জীবনে দু’জন একই রুমমেট ছিলেন । মাহবুব আলমগীর আলোকে খুলে বললাম বিষয়টি । আলো শুনে সাহায্য করতে সম্মত হলো । আজিম সাহেবের সাথে আমার পূর্ব পরিচয় ছিলোনা । আলো এবং শাহীনকে নিয়ে ঢাকায় চলে গেলাম।
অনেক চেষ্টা তদবিরের পর অবশেষে জনাব ফজলুল আজিম সাহেবের স্বাক্ষাত পেলাম। তখন পবিত্র রমজান মাস , তিনি সন্ধ্যায় ইফতারের দাওয়াত দিলেন গুলশানে তার বাসায়। সন্ধ্যায় যথারীতি আমরা হাজির হলাম আজিম সাহেবের বাসায় ইফতারের টেবিলে বসেই ঘটনার বিস্তারিত আলোচনা করলাম। ধৈর্য ধরে মনোযোগ দিয়ে তিনি আমার সব কথা শুনলেন, এবং জনাব কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সাথে দেখা করতে সম্মত হলেন। আজিম সাহেব ব্যস্ত একজন মানুষ তখন সংসদ অধিবেশন চলছিল। প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা তার পিছনে লেগে থাকি। কখন তিনি আমাকে নিয়ে চীফ ইঞ্জিনিয়ারের অফিসে যাবেন। প্রায় এক মাস অপেক্ষার পর একদিন জানালেন পরের দিন সকাল ১০টায় কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সাথে স্বাক্ষাতের সময় পাওয়া গিয়েছে। সকালে খুব ভোরে উঠে আমরা তিন জন এলজিইডি অফিসে এসে হাজির হলাম। আজিম সাহেবও সময় মত এসে হাজির। কিন্তু দুর্ভাগ্য কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী বিশেষ প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ব্যস্ত থাকায় সময় মত অফিসে আসতে পারেন নাই। আজিম সাহেব ঘন্টা খানেক অপেক্ষা করে চলে গেলেন। ইতিমধ্যে ঈদের ছুটিতে অফিস বন্ধ হয়ে গেল। ব্যর্থ হয়ে নোয়াখালী চলে গেলাম। হাল ছাড়লাম না। ঈদের পর আবারো তিনজন ঢাকায় চলে গেলাম। শুরু হলো অপেক্ষার পালা। কখন আজিম সাহেব চীফ ইঞ্জিনিয়ারের সাথে স্বাক্ষাত করবেন। অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো। আমরা চীফ ইঞ্জিনিয়ারের সাথে দেখা করলাম। তিনি মনোযোগ দিয়ে সব শুনলেন।এবং এই অপরিণামদর্শী প্রকল্প গ্রহণ করায় পিডিকে ডেকে এনে কিছু কথা শুনিয়ে দিলেন। প্রকল্পটি নিয়ে এলজিইডি সারা দেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। পিডিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলেন। যেই লাউ সেই কদু ! আবারো অপেক্ষার পালা।মাসের পর মাস যায়। মাসের অধিকাংশ দিন আমি ঢাকায় পড়ে থাকি। আমার চলমান অন্যান্য কাজগুলো প্রায় বন্ধ। সময়মতো কাজ সমাপ্ত করতে না পারায় বার বার সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করছি।
একজন মানুষ যখন চরম হতাশা গ্রস্ত হয়ে পড়ে তখন সেই বিভিন্ন বাজে অভ্যাসের দিকে ধাবিত হয়। আমিতো আর কোন মনি ঋষি নয় ! রক্তে মাংসে গড়া মানুষ। আমিও ধীরে ধীরে সেই পথে হাঁটতে শুরু করলাম।
ইতিমধ্যে আমার দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সহকর্মী এবং বন্ধু মোবারক হোসেন আজাদ আমাকে সাহায্য করতে হাত বাড়িয়ে দিলো। আমার হতাশা এবং মানসিক শান্তনার জন্য বিভিন্ন ভাবে উপদেশ এবং সহমর্মিতা দেখালো। দীর্ঘ আলোচনার পর স্থির করলাম অতীত ভুলে আবার কাজে মনোযোগ দিতে হবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অর্থ আটকে পড়ে থাকায় এবং কাজের প্রতি অনীহা চলে আসায় বেশ কিছুদিন কোন টেন্ডারে অংশ গ্রহণ করা হয় না। দু’জনে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম আগামীতে যৌথ ভাবে ব্যবসা করবো। সেই মোতাবেক আমরা বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে টেন্ডার দিতে শুরু করলাম । ১৯৯৩ সালে লক্ষীপুর সড়ক বিভাগের অধীনে রামগঞ্জে একটি সড়কে প্রায় ১৫ লক্ষ টাকার মাটি ভরাটের একটি কাজ করে ছিলাম,কিন্তু কাজটির চুড়ান্ত বিল করি নাই । নোয়াখালী সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর সাথে আজাদের ভালো সম্পর্ক ছিলো । আজাদকে প্রস্তাব দিলাম কাজটি বর্ধিত করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর সাথে আলাপ করার জন্য ।
ছয় সাত বছর আগের কাজ তার পরও তত্ত্ববধায়ক প্রকৌশলী কাজটি আরো ৫লক্ষ টাকা বর্ধিত করতে সম্মত হলেন । যুক্তি হিসাবে তিনি ছয় বছর আগের দরপত্রের প্রাক্কলিত ব্যয় এবং বর্তমান প্রাক্কলিত ব্যয়ের মধ্যে পার্থক্যের কারণে সরকারের আর্থিক লাভের কথা উল্লেখ করে প্রস্তাবনা তৈরি করে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর কাছে পেশ করলেন । অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী প্রস্তাবটি অনুমোদন করে দিলেন । কথা ছিলো আজাদ এবং আমি যৌথ ভাবে পুঁজি বিনিয়োগ করে কাজটি করবো । কাজটি চলতি অবস্থায় নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে আজদের নামে খাল পূর্ণ খননের একটি কাজ এবং নোয়াখালী সড়ক বিভাগের অধীনে আমার নামে আরেকটি কাজ পেয়ে গেলাম । এই তিনটি কাজেই যৌথ বিনিয়োগ করে করার কথা । কিন্তু আমি কথামত সমপরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে ব্যর্থ হই । তার পরেও আজদ মহানুভবতা দেখিয়ে লাভের অংশ সমান ভাগে ভাগ করে দেয় ।
আকাশ থেকে হঠাৎ খসে পড়া নক্ষত্রের পতন যেমন নীচ থেকে ঠেকানো যায় ন। অসংখ্য সুহৃদ বন্ধু, শুভানুধ্যায়ীদের আন্তরিকতা এবং শত প্রচেষ্টা শর্তে ও আমার পতন ঠেকানো সম্ভব হয়নি। দিনে দিনে আমার মানসিক যন্ত্রণা এবং হতাশার পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে লাগল। সাথে সাথে আড্ডার পরিমাণও বৃদ্ধি পেতে লাগল। মদ্যপান এবং ক্লাবে বসে রাত দিন জুয়া খেলা আমার নিত্য নৈমিত্তিক কাজে পরিণত হলো। পারিবারিক অশান্তির পরিমাণ ও বৃদ্ধি পেল। মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেল, কেউ ভালো কথা বললেও আমি রাগ করতাম। এই দিকে পাওনাদাররা তাদের পাওনা পরিশোধের জন্য চাপ দিতে লাগলো।
দীর্ঘ একবছর চার মাস পর এলজিইডি আফিস থেকে আমাকে চিঠি দিয়ে জানানো হলে কাজটি পূর্ণ সংস্কার করে দেওয়ার জন্য । আমি নির্বাহী প্রকৌশলীর, এবং উপজেলা প্রকৌশলীর সাথে দেখা করতে গেলাম এবং তাদেরকে বুঝাতে চেষ্টা করলাম কাজটি এই মুহুর্তে পূর্ণ সংস্কার করা আমার পক্ষে কোন ভাবেই সম্ভব নয় । কিন্তু সবার একেই কথা কাজটি পূর্ণ সংস্কার না করলে তাদের কিছুই করার নাই । এই নিয়ে উভয়ের সাথে আমার চরম উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়ে গেল, উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের এক পর্যায়ে নির্বাহী প্রকৌশলী বলে বসলেন আমি যে কাজটি শেষ করেছি তার কি প্রমাণ আছে ? যেই আশঙ্কাটি আমি করে আসছি তাই বলে বসলো । আসলে আমার কাছে কোন প্রমাণইতো নেই । যেহেতু এমবিতে কোন রেকর্ড নাই ।এলজিইডির শক্ত অবস্থানের কারণ হলো কাজের মেজারমেন্ট বুকে কোন রেকর্ড নেই । হঠাৎ আমার মাথায় আসলো রোলারের লগ বই এর কথা । আমি বললাম আমি যে কাজ করেছি এমবিতে রেকর্ড নাই ঠিক, কিন্তু রোলারের লগ বই পরিক্ষা করলে দেখবেন কাজ করেছি কি করি নাই । আমার কাজের অনুকুলে যেই রোলার ইসু করা হয়েছিলো এলজিইডির নিয়ম অনুযায়ী রোলার ভাড়ার অংশিক টাকা অগ্রিম পরিশোধ করতে হয় । রোলার ড্রাইভার প্রতিদিন কি কাজ করেছে লগ বইতে উল্লেখ করতে হয় । এই হালকা যুক্তিতে যদিও প্রমাণ হয়না তার পরও আমি বিষটি নিয়ে ওদের সাথে জোরালো ভাবে তর্কবিতর্ক করে যাচ্ছি । শত চেষ্টা তদবির করেও কোন লাভ হলো না । শেষ পর্যন্ত প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা ব্যয় করে আবার কাজটি পূর্ণ সংস্কার করে দিতে হলো । কাজটি করতে গিয়ে যাদের কথা আমার বিশেষ ভাবে মনে পড়েছে তারা হলেন জনাব জসিম উদ্দিন , এবং চন্দন সেনের কথা । ইতিমধ্যে দু’জনই বদলী হয়ে কর্মস্থল নোয়াখালী ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গিয়েছে । হাতে থাকা অন্যান্য দপ্তরের কাজগুলি শেষ করার জন্য আমার প্রচুর নগদ টাকার প্রয়োজন হয়ে পড়ে । আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই দু’জন পাশে থাকলে আমাকে সাহায্য করতে কৃপনতা করতেন না।
অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে কাজ গুলি শেষ করেছি বটে । কিন্তু সময় মত কাজ সমাপ্ত করতে না পারায় কোন কাজেই লাভতো দুরের কথা পুঁজি ফেরৎও পেলাম না । এলজিইডির কাজেই লোকসানের পরিমানণ ছিলো প্রায় ৩০লক্ষ টাকার উপরে । এই ছাড়া কাজের ব্যাপারে দৌড়াদড়ি করে আরো কয়েক লক্ষ টাকা ক্ষতি হয়।
একে একে সব গুলি কাজে বিপুল অর্থ লোকসানের ফলে আমি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি । ধার দেনা পরিশোধ করে আমি চরম অর্থ সংকটে পড়ে যাই । অর্থ লোকসানের পাশাপাশি আমার ব্যবসায়িক সুনাম মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একদিকে আর্থিক লোকসান আন্যদিকে পারিবারিক কলহ মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পেতে থাকে । আমার অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের কারণে পারিবারিক কলহ চুড়ান্ত রুপ নেয়। বিশেষ করে আমার বাবা মায়ের বদ্ধ মূল ধারণা আমার উশৃঙ্খল জীবন ধারণ এবং অসৎ পথে অর্থ অপচয়ের ফলে এই দূরর্দশার জন্য দায়ী। আমি তাদেরকে কোন ভাবেই বুঝাতে পারলাম না, পূর্বে আমি এই রকম কখনো ছিলাম না। বাবা মায়ের সাথে মনোমালিন্য করে এক পর্যায়ে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে গেলাম।
বন্ধু হলো কখনো কখনো জীবনের আর্শিবাদ।একজন ভালো বন্ধু মানুষের জীবন চলার গতি প্রকৃতিকে পাল্টে দিতে পারে । কথায় বলে, বন্ধুত্বে যদি সত্যিই প্রাণের টান থাকে তবে ৫০বছরে কোন যোগাযোগ না থাকার পরে দেখা হলে বন্ধুরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। ইফতেখারুল কবির জুয়েল তাদেরমধ্যে অন্যতম একজন।খুব ছোট বেলা থেকে পরিচয়। এক সঙ্গে সরকারি আবাসিক এলাকায় থাকতাম পাশাপাশি বিল্ডিং এ।ওর বাবার বদলির সুত্রে মাঝে বেশ কয়েক বছর দূরে ছিল। আবার যখন ফিরে এলো তখন একেবারে প্রতিবেশী হয়ে ফিরে এলো। দু’জনের মধ্যে সৌহার্দ্যের সম্পর্ক আবারো গড়ে ওঠে। সার্বক্ষণিক সঙ্গি হিসেবে চলতে থাকি অনেক দিন। সময়ের প্রয়োজনে এক সময় সে ঢাকায় চলে যায়, আমিও কর্ম জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ি ।দু’জনের মাঝে অনেক দিন কোন যোগাযোগ ছিলনা । সে নোয়াখালী আসলে চলার পথে কখনো দেখা হলে কথা হতো ।এর বেশী তেমন যোগাযোগ ছিলনা।
বাড়ি থেকে অভিমান করে সোজা ঢাকায় চলে গেলাম।
ঢাকায় হোটেল বসে বসে চিন্তা করতে লাগলাম কি করা যায়, কার সহযোগিতা নেওয়া যায়। কেন জানি হঠাৎ জুয়েলের কথা মনে পড়ে গেল ! নীচে গিয়ে জুয়েলের মোবাইল নাম্বারে ফোন দিলাম। ভাগ্য ভালো একদিন জুয়েল মোবাইল নাম্বারটা দিয়েছিলো। ফোন রিসিভ করার পর নাম বলতেই কোথায় আছি? কেমন আছি জানতে চাইলো।কুশলাদি বিনিময়ের পর আমি তার সাথে দেখা করতে চাই বললাম। জুয়েল অফিসের ঠিকানা দিলো পরের দিন দেখা করার জন্য। গভীর রাত পর্যন্ত চিন্তা করলাম জুয়েলকে কি বলবো?
অথৈই সমুদ্রে পড়ে মানুষ যেমন খড় কুটো ধরে বাঁচাতে চায় আমিও অনেক চিন্তা করে ঠিক করলাম আমাকে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করবো। জুয়েল তখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জিএম হিসেবে কাজ করে। পরের দিন ছিল বাংলা নববর্ষ। জুয়েলের দেওয়া ঠিকানা মত তার অফিসে চলে গেলাম। অনেক দিন পর দেখা, উঠে এসে বুকে জড়িয়ে নিলো।অনেক্ষণ অফিসে আড্ডা দিয়ে দুপুরে খাওয়া খেতে গুলশানে ধানসিঁড়ি রেস্টুরেন্টে চলে গেলাম দু’জনে।খাওয়ার টেবিলে বসেই ঘটনার বিস্তারিত তাকে খুলে বললাম। দীর্ঘ আলোচনার পর শেষে হোটেল থেকে বের হয়ে আমরা দু’জন রিক্সা নিয়ে উদ্দ্যেশ্যহীন ভাবে সেই দিন অনেকক্ষণ ঘুরেছি।রিক্সায় এই প্রসঙ্গে আর কোন আলোচনাই হলোনা। সন্ধ্যার পর আবার তার অফিসে বসে আড্ডা দিতে লাগলাম, অনেক রাত পর্যন্ত জুয়েলের সাথে আড্ডা দিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম। পরে দিন যথারীতি আবার ওর অফিসে গেলাম সারাদিন আড্ডা দিয়ে দুপুরের খাবার খেতে আজ জুয়েলের বাসায় গেলাম,ওর বাসা তখন রামপুরা। বিকেলে আজও রিক্সা নিয়ে উদ্দ্যেশ্যহীন ভাবে ঢাকা শহরের অনেক অলিগলিতে ঘুরেছি।অতীতের অনেক গল্প করলাম দু’জন।নোয়াখালীতে আমরা একসাথে একই রাজনৈতিক দল করতাম, দু’জন চৌমুহনী কলেজে পড়াশোনা করতাম। কলেজ জীবনের অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা, রাজনৈতিক জীবনের নানান ঘটনা ছিলো আলোচনার বিষয় বস্ত। সময় ফেলে রিক্সা নিয়ে উদ্দ্যেশ্যহীন ভাবে ঘুরাঘুরি আর অফিসে বসে বসে আড্ডা দেয়া আমার নিত্য নৈমিত্তিক কাজে পরিণত হলো।সময়ে সময়ে আমার পকেট খরচ থেকে শুরু করে খাওয়া দাওয়া সব কিছু তখন সেই করছে। প্রায় পনেরো দিন পর জুয়েল জিজ্ঞেস করলো, এখন কি করবি চিন্তা করলি ? আমি নিঃসংকোচে আমর অভিপ্রায়ের কথা খুলে বললাম। অর্থাৎ এই মূহুর্তে আমার একটি চাকরির বিশেষ প্রয়োজন। আমরা কথা শুনে জুয়েল একটু হাসলো। বললো তাহলে চাকরি করবে ঠিক করেছ? এই বলে আবারো অন্য প্রসঙ্গে আলোচনা করতে লাগল। পরে দিন জুয়েলের বাসায় গেলাম রাতে সেখানে ছিলাম। অনেক আলোচনার পর জুয়েল বললো, দেখ যেখানে শেষ সেখান থেকে তোকে আবার শুরু করতে হবে। আমি বললাম এখন আর সম্ভব নয়। আমার আর এই ব্যাবসা করতে ইচ্ছে করে না। ঠিকাদারি ব্যাবসার প্রতি আমার বিতৃষ্ণা চলে এসেছে।জুয়েল বললো আমি ইচ্ছা করলে তোমাকে একটা চাকরি জোগাড় করে দিতে পারি। কিন্তু আমি চাইনা তুমি চাকরি কর। আমি চাই তুমি আবার ব্যবসা শুরু কর। এর পর সারা রাত এই বিষয়ে অনেক আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হলো আবার টেন্ডার দেওয়ার। আমার সড়ক ও জনপথ বিভাগের লাইসেন্স দিয়ে সারা দেশে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকার একক টেন্ডারে অংশ গ্রহণ করার যোগ্যতা আছে। সিদ্ধান্ত হলো এক সপ্তাহের মধ্যে কোথাও একটি বাসাভাড়া নিয়ে সেখানে উঠার। আলোচনা মত নোয়াখালী থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে এসে ঢাকায় আরামবাগে একটা বাসায় উঠলাম। মে মাস থেকে সড়ক বিভাগে সাধারণত টেন্ডার আহ্বান করা শুরু হয়। ঢাকা সহ সারা দেশে টেন্ডারে অংশ গ্রহণ করা শুরু করলাম। মে মাস থেকে শুরু করে জুলাই মাস পর্যন্ত সারা দেশে কয়েকশ টেন্ডারে অংশ গ্রহণ বাবদ সিডিউল ক্রয় করে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা খরচ করেও দুর্ভাগ্যজনক ভাবে কোথাও লটারিতে কোন কাজ ফেলাম না । শুধু সিডিউল নয় যেই সব জেলায় টেন্ডারে অংশ গ্রহণ করেছি প্রতি দিনই কোন না কোন জেলায় লটারিতে স্বশরীরে উপস্থিত থাকতে গিয়ে যাতায়ত, থাকা খাওয়া সহ আরো অনেক টাকা খরচ করতে হয়েছে । এই খাতে সমস্ত অর্থই জুয়েল ব্যয় করেছে । (চলমান)ফিরে দেখা ফেলে আসা দিন গুলিঃ-
————————————————-

(লেখাটি সাধারণ কোন স্ট্যাটাস নয় । আমার ঘটনা বহুল জীবনের খন্ডিত জীবন কাহিনী মাত্র)

জীবনে কখনো কখনো বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া খুব কঠিন।বাস্তবতা প্রকৃতির মত পরিবর্তনশীল।এতে কখনো সুখের ছোঁয়া আসে,কখনো হয়ে যায় দুঃখময় । বস্তাবতাকে মানিয়ে নেয়ার অভ্যাস নিজ থেকে চলে আসে, একে মেনে নিতে হয় । অনেকের মুখে শুনেছি মানুষের জীবনে ৮০% বাস্তবতা আর ২০% আবেগ নাকি খুব বেশি জরুরী।জীবনের বাস্তবতার বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, যতই নিষ্ঠুর হউক বা যতই কষ্টের হউক তা সয়ে নিতে হয়, মেনে নিতে হয় জীবনের প্রয়োজনেই। জীবনে কষ্ট আসলে মানসিক ভাকে যতটুকু ভেঙ্গে পড়বে জীবন তার দ্বিগুন পিছিয়ে যাবে। জীবনের সকল দূঃখ কষ্ট ও বাস্তবতাকে জীবনের অংশ হিসাবে মেনে নিয়ে স্বাভাবিক ভাবে গ্রহন করার নামই হচ্ছে সুখ।আর জীবনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে , সে কখনও এক পথে চলেনা। মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী চলেনা। কষ্ট কখনো কখনো এমন ভাবে আসে যখন চোখ বন্ধ হয়ে যায়। কান বধির হয়ে যায়।কন্ঠ বোবা হয়ে যায়। বুদ্ধি নির্বোধ হয়ে যায়। শরীর পঙ্গু হয়ে যায়। দিশেহারা জীবনে সব পরিকল্পনা ছাড়খার হয়ে যায়। তারপরও মানুষকে বেঁচে থাকতে হয় জীবনের অদৃশ্য প্রয়োজনে। আমি জানিনা কি সে প্রয়োজন? জীবনের কোথায় যেন কিসের একটা অদৃশ্য টান। আমার অনুপস্থিতিতে সব চলছে যথারীতি। তারপরও মনে হয় আমিই যেন সব সমস্যা সমাধানের একমাত্র ভরষা। মনে হয়, আমি ছাড়া সমস্যা সমাধানের আর কেউ নাই, আমাকে ছাড়া ? অসম্ভব ! এই মনে হয় বলেই হয়তো হাজার যন্ত্রনা সয়ে বেঁচে আছি !! কিছু অভিজ্ঞতা থেকে এখন বারবার মনে হয় –চলমান সময় যত কষ্টেরই হোক, পরবর্তীতে যদি সাফল্য পাওয়া যায়, তখন আগের কষ্টের কথা মনে থাকে না। কিছু বিষয় আছে যেগুলো ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। কত কঠিন সময় যে মানুষের জীবনে আসে, যার শতভাগের একভাগ অন্য কোন মানুষ অনুভব করতে পারে না, কেবল যিনি ভুগছেন, তিনিই বুঝেন।
আজ আমার জীবনের কিছু ঘটনাবলী এবং কিছু মানুষের সরব উপস্থিতি,তাদের আন্তরিকতা, আমার প্রতি তাদের অকৃত্রিম ভালবাসার কথা কেন জানি বারবার মনে পড়ছে । আমার এই লেখা অনেকের কাছে হয়তো উদ্ভট অলীক কাহিনী মনে হতে পারে ! কিন্তু সত্যি বলছি এই কাহিনী আমার জীবনের একটি অধ্যায় । এখানে বিন্দুমাত্র মিথ্যার লেশ নাই ।
২৮ এপ্রিল ২০১৭ দশ বছর আগে ২০০৭ সালের এই দিনে বিপুল আশা এবং উদ্দীপনা নিয়ে ইউরোপের পথে আমার যাত্রা । জীবনে কখনো, জীবন এবং জীবিকার তাগিদে প্রবাসে এসে থাকতে হবে তা ছিলো আমার কল্পনাতীত । কিন্তু কিছুটা নিজের অনিয়ন্ত্রিত এবং অমিতব্যয়ী জীবন যাপনের কারণে অবার কিছুটা ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে অনেকটা বাধ্য হয়ে বিদেশে আগমন । যাক এই প্রসঙ্গে পরে আলোচনা করবো । জানিনা কেন জানি এই এপ্রিল মাসটা আমার জীবনের অনেক পালাবদলের সাথে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে আছে ! কাকতালীয় ভাবে আমার জীবনে যত গুলি কাজে হাত দিয়েছি তার অধিকাংশই এপ্রিল মাসে ! ১৯৮৯ সালের শুরুর দিকে কিছু একটা করার চিন্তা মাথায় আসলো । কিন্তু কি করবো ঠিক করতে পারছিলাম না । বেশী ভাবাভাবি না করে অবশেষে স্থীর করলাম ঔষধের ব্যবসা করার ।পূর্বকোন অভিজ্ঞতা নাই, কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসাও বটে তারপরও সাহস করে নতুন ব্যবসায় হাত দিলাম । জীবনের প্রথম ব্যবসা শুরু করলাম ৮৯এর এপ্রিল মাস থেকে । ভালোই চলছিলো ব্যবসা । কিন্তু তিন বছরের মধ্যে আমি কেমন জানি হাঁফিয়ে উঠেছি । সরাক্ষণ বসে বসে ব্যবসা করতে ভালো লাগছিল না । কোন ভাবেই ঔষধ ব্যবসায় মন বসাতে পারছিলাম না । নতুন কিছু করার জন্য ছটফট করতে লাগলাম । এরেই মধ্যে সড়ক ও জনপদ বিভাগে ঠিকাদারির একটা লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে ফেললাম। মনে মনে স্থীর করলাম ঠিকাদারি ব্যবসাই করবো । কুমিল্লা সড়ক সার্কেল অফিস থেকে নতুন লাইসেন্স নিয়ে নোয়াখালী ফিরে আসার পথে জানতে পারলাম পররের দিন নোয়াখালী সড়ক বিভাগে টেন্ডার আছে আজই সিডিউল বিক্রির শেষ দিন । কুমিল্লা থেকে ফিরে আসতে আসতে রাত প্রায় ৮টা বেজে গেল । বাস থেকে নেমে সোজা সড়ক ভবনে চলে গেলাম । ক্যাশিয়ার বসে বসে সারা দিনের সিডিউল বিক্রির হিসাব নিয়ে কাজ করছিলো । বিকেল ৫টায় সিডিউল বিক্রির শেষ সময় । আমি রাত ৮টায় ক্যাশিয়ারকে অনুরোধ করলাম আমাকে দুটি সিডিউল দেওয়ার জন্য ! ক্যাশিয়ার ছিলো একজন হিন্দু ভদ্রলোক । আমার ঔষধ দোকানের সুবাধে কিছুটা পূর্ব পরিচয় ছিলো । কিন্তু এই সামান্য পরিচয়ে ভদ্রলোক কিছুতেই সময় অতিক্রমের পর সিডিউল বিক্রি করতে সম্মত হচ্ছিল না । আমিও নাছোড়বান্দা কিছুতেই তার পিছন ছাড়ছি না । অনেক পীড়াপীড়ির পর ক্যাশিয়ার সিডিউল দিতে সম্মত হলো , কিন্তু শর্ত হলো কোন অবস্থাতেই অফিসে সিডিউল দেওয়া যাবে না রাত ১১টার পর আমার দোকানে দিয়ে আসবে । ভদ্রলোকের কাছে আমি কৃতজ্ঞ কথামত আমাকে দুটি সিডিউল দিয়েছেন। অনেক পীড়াপীড়ী করেও সিডিউলের নির্ধারিত মুল্যের অতিরিক্ত কোন টাকা ভদ্রলোককে দিতে পারিনি । অনেক রাত পর্যন্ত পূর্ব পরিচিত একজন ঠিকাদারের সহযোগিতায় সিডিউল পূরণ করে সকালে যথা সময়ে আমার জীবনের প্রথম ঠিকাদারি কাজের সিডিউল টেন্ডার বক্সে ফেলে এলাম। আশ্চর্যজনক হলোও সত্যি মাসটি ছিলো এপ্রিল মাস। সম্ভবত ৫দিন পর কুমিল্লা সড়ক সার্কেল অফিসে লটারী অনুষ্ঠিত হলো । আমি কাজ পাওয়ার ব্যাপারে তেমন আশাবাদী ছিলাম না,তাই কষ্ট করে কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত লটারীতে নিজে গেলাম না । বিকালে লটারীর খবর সংগ্রহ করার জন্য নোয়াখালী সড়ক ও জনপদ অফিসে গিয়ে জানতে পারলাম একটি মাত্র কাজ নোয়াখালীর কোন একজন ঠিকাদার পেয়েছে কিন্তু কেউ ঐ ঠিকাদারকে চেনেনা। আমি কুমিল্লা ফেরৎ একজন পরিচিত ঠিকাদারকে জিজ্ঞেস করলাম কাজ পাওয়া ঐ ফার্মে নাম কি ? আমার প্রতিষ্ঠানের নাম ভালো ভাবে বলতে না পারলেও যতটুকু বুঝতে পেরেছি কাজটি আমিই পেয়েছি ।বিলম্ব না করে একটি মাইক্রো নিয়ে পরিচিত দুজন ঠিকাদার সহ তখনই কুমিল্লার পথে যাত্রা শুরু করলাম।কুমিল্লা সড়ক ভবনে এসে নিশ্চিত হলাম কাজটি আমি পেয়েছি । শুরু হলো জীবনের নতুন আরেকটি অধ্যায়ের । কাজটি তেমন বড় ছিলনা ঠিক কিন্তু প্রথম অংশ গ্রহণে সাফল্য আসায় পূর্ণোদ্যমে লেগে গেলাম । নোয়াখালী,লক্ষীপুর, ফেনী সড়ক বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়ন মূলক কাজের টেন্ডারে অংশ গ্রহণ করতে শুরু করলাম । ধীরে ধীরে আরো সাফল্য আসতে শুরু করলো । একের পর এক কাজের সংখ্যা বৃদ্ধি ফেতে লাগলো ।আমিও কিছুটা উচ্চবিলাসী এবং বেপরোয়া হয়ে ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধি করে সড়ক ও জনপথ বিভাগের বাহিরে অন্যান্য দপ্তরে লাইসেন্স করতে শুরু করলাম । ফ্যাসিলিটিজ ,এলজিইডি , পাবলিক হেলথ,নোয়াখালী পৌরসভা,সহ অন্যান্য দপ্তরের দরপত্রে অংশ গ্রহণ করে সেখানেও সাফল্য পেতে শুরু করলাম । বিভিন্ন দপ্তরের চুক্তিবদ্ধ কাজ গুলি সুচারু রূপে সময়মত শেষ করতে চেষ্টা করছি ,এতে করে সব দপ্তরে আমার আলাদা একটা সুনাম বৃদ্ধি পেতে লাগলো ।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে গিয়ে দু’জন মানুষ আমাকে বিষম ভাবে অনুপ্রাণিত করেছে ।কারো সাথেই আমার পূর্ব পরিচয় ছিলো না । কিন্তু কি ভাব যে এরা আমার জীবনের সাথে মিশে গেছে আমি নিজেও জানিনা । জসিম উদ্দিন, ছেলেটির বাড়ি চট্রগ্রাম । ইউসিবিএল ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার হিসাবে নোয়াখালীতে আসে । দেখতে গোলগাল টাক মাথার ফর্সা ফুটফুটে অল্প বয়সের একটি ছেলে।আমার দোকানের পাশেই ছিল ইউসিবিএল ব্যাংক । টাকা লেনদেনের জন্য ব্যাংকে গেলে বা রাস্তায় আমার চোখের সামনে পড়লে আমি টিপ্পনি কাটতাম । টিপ্পনির ভয়ে সব সময় আমাকে দেখলে এড়িয়ে চলতো।মনে হয় অসহ্য হয়ে শুধু শুধু একটা সিভিট বা এ্যান্টাসিড ট্যাবলেট ক্রয়ের অজুহাতে দোকানে আসতে থাকে । আমি সামনে কিছু না বললেও যাওয়ার পথে ঠিকই কিছু না কিছু বলে মন্তব্য করতাম । ধীরে ধীরে কি ভাবে যে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্টতা গড়ে উঠে।বন্ধু মানে আত্মার আত্মীয়,যে আত্মীয়তা কখনো কখনো রক্তের বন্ধনকেও ছাড়িয়ে যায়। প্রকৃত বন্ধু হচ্ছে সেই যে সুখের সময় যেমন হাসিমুখে পাশে থাকে, তেমনি দুঃখের দিন গুলোতেও লড়াইয়ে সাহস জোগায় । কিছুদিনের মধ্যে ও হয়ে যায় আমার সর্বক্ষণের সাথী । অত্যন্ত বিশ্বাসী এবং হিতকারী একজন মানুষ । আমার আপদ বিপদে সাবার আগে তাকে কাছে পেয়েছি । যখন যা কিছুর প্রয়োজন হয়েছে অনেক সময় সাধ্যের বাহিরে হলেও আমার জন্য চেষ্টা করেছে । কাজ শেষ করে যত রাতই হোক তার সাথে একবার দেখা করতাম । ঘনিষ্ঠতা হওয়ার পর আমি কখনো ব্যাংকে লেনদেনের চেকবই আমার কাছে রাখতাম না ।নিজে কখনো চেকবই লেখতাম না । ব্লাঙ্ক চেকবই সই করে তার কাছে রেখে দিতাম । যখন যত টাকার প্রয়োজন হয়েছে আমার একাউন্টে টাকা থাকুক আর না থাকুক আমার যত টাকার প্রয়োজন হোক সেই ব্যবস্থা করে দিয়েছে ।বিনিময়ে কখনো কিছু আশা করেনি । আপন ভাইয়ের মত সব সময় আমার পাশে থেকেছে । তার সুবাধে সম্পর্ক গড়ে উঠে ব্যাংক ম্যানেজার চন্দন সেনের সাথে । এই ভদ্রলোক যতদিন নোয়াখালী ব্রাঞ্চে কর্মরত ছিলেন অকৃত্রিম ভাবে আমাকে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন । শুধু আমাকে নয় তখনকার সময়ে আমাদের অনেক ঠিকাদার বন্ধুকে তিনি সাহায্য করতে দেখেছি।ডেকে এনে কারো সিডিআর বা ব্যাংক ড্রাফটের প্রয়োজন হলে নিজের একাউন্ট থেকে টাকা দিয়ে সহযোগিতা করতে দেখেছি। আমি নিজেও বড় কোন টেন্ডারে অংশ নিতে সিডিআর বা ব্যংক ড্রাফটের প্রয়োজন হলে তাঁর কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছি বা নগদ টাকার বিশেষ প্রয়োজন হলেও তিনি কখনো নিষেধ করেননি । ক্ষুদ্র জীবনে এই সকল মানুষের সান্নিধ্য লাভ আমার জীবনে উৎকর্ষ সাধনে অপরিসীম ভূমিকা আছে। ইচ্ছা করলেই এদের অবদান বা স্পর্শানুভূতির কথা কখনো ভুলতে পারিনা। সাফল্য যখন হাতের মুঠে ধরা দিতে লাগলো দুর্ভাগ্য এবার পিছু নিলো ।
১৯৯৭ সালে নোয়াখালী এলজিইডির অধিন সোনাপুর – আখতারমিয়ার হাট সড়ক উন্নয়নের একটি কাজের দরপত্রে অংশ গ্রহণ করলাম । যথারিতি কাজটি পেলামও বটে । ৩০ কিঃমিঃ দৈর্ঘ্য সড়কটি ৩কিঃমিঃ করে ১০ গ্রুপে দরপত্র আহ্বান করা হয় । প্রতিটি গ্রুপের প্রাক্কলিত মূল্য ছিলো ৫৫লক্ষ টাকার কিছু বেশি । কাজটির ধরণ বা নির্মাণ পদ্ধতি ছিলো কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির । মাটি, বালি, খোয়ার সংমিশ্রণে বেজমেন্ট প্রস্তুত করে সড়ক পাকা করণের কাজ যার সংক্ষিপ্ত নাম এএসএস ASS ভিন্ন অর্থে (গাধা), আরেকটি অর্থ আছে যা অপ্রকাশ্য থাকাই শ্রেয়। স্বল্প ব্যয়ে গ্রামীন সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের নামে সরকার তথা জনগণের অর্থ অপচয়ের একটি প্রকল্প । কিছু না বুঝেও কাজটি শুরু করার প্রস্তুতি নিলাম যথা সময়ে । সড়ক নির্মাণের প্রয়োজনীয় ইট বালু সহ অন্যান্য মালামাল নিতে শুরু করলাম । সড়কটি খুবই দুর্গম এলাকায়, যাতায়ত ব্যবস্থা ছিলো আরো করুণ । গাজীর খেয়া স্থানীয় ভাবে (গাইজ্জার খেবা নামে) পরিচিত খালের উপর কোন ব্রীজ কালভাট ছিলোনা । শুস্ক মৌসুমে খালের মধ্যে বাঁধ দিয়ে বিকল্প সড়কে সল্প পরিসরে কিছু গাড়ী চলাচল করতো মাত্র। আমরা ১০জন ঠিকাদারের মধ্যে আমিই প্রথম কাজটি শুরু করার উদ্যোগ গ্রহণ করি । বিশ্বাস করবেন কিনা দৈবক্রমে মাসটি ছিলো এপ্রিল মাস । বর্যা মৌসুম শুরুর আগে কাজটি শুরু করলাম । প্রায় ১কিঃমিঃ রাস্তার বেজমেন্ট শেষ করতে না করতে বর্ষা শুরু হয়ে গেল । সড়ক যাতায়তে অনুপযোগী হয়ে পড়ায় সড়কের পাশে সমস্ত মালামাল রেখে কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলাম । একটি বছর সড়কের পাশে ফেলে রাখা আমার ইট বালির অধিকাংশ বেহাত হয়ে যায় । সড়কের পাশে বাড়ির মানুষ গুলি বিক্ষিপ্ত ভাবে পড়ে থাকা ইট বালি দিয়ে ঘরের ভিটি পাকা থেকে শুরু করে পুকুর ঘাট পাক করতে শুরু করে । স্থানীয় একজন লোককে পাহারাদার হিসাবে রেখে আসি। পরে খবর নিয়ে জানতে পারি ঐ পাহারাদার সড়কের ইট বালি দিয়ে নিজ বাড়িতে সেমিপাকা একটি ঘর তৈরী করেছে । যাক শুস্ক মৌসুমে পরবর্তী বছর আবার কাজ শুরু করলাম । আমার হাতে তখন নোয়াখালী সড়ক বিভাগের অধীনে বেগমগঞ্জ- চাটখিল – রামগঞ্জ সড়ক মেরামতের একটি কাজ, ফেনী সড়ক বিভাগের অধীনে একটি সড়ক মেরামতের কাজ এবং ফ্যাসিলিটিজ ডিপাটমেন্টের অধিনে মাইজদিতে তিনতলা বিশিষ্ট একটি স্কুল ভবন নির্মাণের কাজ । যাতায়ত ব্যবস্থা দুর্গম হওয়ায় এবং ফেনী চাটখিলের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এলজিইডির কাজে খুব একটা সময় দিতে পারছিলাম না । কাজ দেখা শুনার জন্য আমার বড় ভাইকে দায়িত্ব দিলাম । কাজটি যেই গতিতে চলার কথা প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ করার পরও প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল পাচ্ছিলাম না । কাজটি নিয়ে আমি কিছুটা হতাশ হয়ে পড়লাম । আর কাজটি করতে গিয়ে আমি যেই মারাত্মক ভুল করেছিলাম তাহলো কাজ চলাকালীন কোন চলতি বিল না নেওয়া । সময়ের অভাবে বিল করবো করবো চিন্তা করেও বিল করা হয়নি । যার ফলে এমবি তে(মেজারমেন্ট বুক) কোন রেকর্ড ছিলোনা । মাথায় চিন্তা ছিলো পুরো কাজ শেষ করে এক সাথে ফাইনাল বিল করবো । বিধিবাম পরবর্তীতে সেইটাই আমার জন্য কাল হলো । কাজটি শেষ হওয়ার দু তিন দিন আগে আবারো এপ্রিল মাস আমার সামনে অন্তরায় হয়ে আসলো । কালবৈশাখীর ঝড়ের কারণে তিনদিন কাজটি বন্ধ রাখতে বাধ্য হই । কার্পেটিং এর কাজ চলাকালে ঝড় বৃষ্টি হলে কাজ করা সম্ভব হয় না । বৃষ্টির পর কাজ যখন শুরু করলাম শেষ দিনে সাত আটশ ফুট কাজ বাকি রেখে আবার কাজ বন্ধ করে দিতে হলো । কারণ ঐ জয়গাটায় ছিলো একটি বাজার । সাপ্তাহিক বাজারের কারণে কাজ করা সম্ভব হয়নি ।
ইচ্ছা ছিলো রাতে কাজ করে হলেও কাজটি সেইদিনই শেষ করে ফেলবো । লেবারদের সাথে সেই ভাবে আলাপও করে রেখে ছিলাম। সন্ধ্যার পর থেকে মুশুলধারে বৃষ্টি আরম্ভ হলো । কয়েক দিন পর্যন্ত অবিরাম বৃষ্টি শুরু হলো, বন্ধ হওয়ার কোন লক্ষণ নাই । লেবাররা দশ দিন অপেক্ষা করে সাইড ত্যাগ করে চলে গেল । একটানা বৃষ্টি আর চরাঞ্চলে সাগরের জোয়ারে নির্মাণধীন সড়ক পানির নীচে তলিয়ে গেল। শুরু হয়ে গেল ৯৮ ভয়াবহ বন্যা । ৩ কিঃমিঃ সড়কের মধ্যে প্রায় দুই কিঃমিঃ সড়কের বিভিন্ন স্থানে দুই থেকে তিন ফুট পানির নীচে তলিয়ে যায় । স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার পর যখন সড়ক থেকে পানি সরতে শুরু করলো অধিকাংশ স্থানে পাকা রাস্তার কোন অস্তিত্ব চোখে পড়লো না । ইটের কণা,পাথর কুচি আর বিটুমিনের সাথে কাদাজলে মিশে একাকার । এলজিইডির বিভিন্ন স্তরের প্রকৌশলীরা সমস্ত সড়ক পর্যবেক্ষণ করে কোন সিদ্ধান্ত দিতে অপারগতা প্রকাশ করছে । ৩০ কিঃমিঃ সড়কের ২০কিঃমিঃ সড়ক মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । অবিশিষ্ট অংশেরও কম বেশী ক্ষতি হয়েছে । আমি ছাড়া অন্যান্য ঠিকাদাররা চলতি বিল গ্রহণ করায় কিছুটা সুবিধা জনক অবস্থানে ছিলো । অনেকেই ফাইনাল বিল জমা দিয়েছে । আমার মত মহা বিপদে আর কেউ পড়েনি । অনেক চেষ্টা তদবীর করেও এসও(সেকশন অফিসার) কে দিয়ে এমবিতে বিল এন্টি করাতে পারনি । অপ্রত্যাশিত এই ঝামেলায় পড়ে আমি মানসিক ভাবে খুবই ভেঙ্গে পড়লাম । অপরাপর কাজ গুলি সঠিক ভাবে দেখা শুনা করতে পারছি না । নতুন করে কোন টেন্ডারে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকলাম। এলজিইডির বিলের পিছনে সারাক্ষণ ছুটোছুটি করতে করতে বাকি কাজ গুলি প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম ।নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন কাজই শেষ করতে পারি নাই । ফলে কাজের ব্যয় বৃদ্ধি পেতে লাগলো । আমি যখন কিছুটা উদভ্রান্ত এবং অস্থীর ভাবে বিল নিয়ে ছুটোছুটি করছি তখন কয়েক জন হিতৈষী বন্ধু আমাকে সহযোগিতার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন । এদের মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য নোয়াখালী পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম রবিউল হোসেন কচি ভাই ।হাতিয়া উপজেলার সাবেক সংসদ সদস্য জনাব ফজলে আজিম । নোয়াখালী জেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলমগীর আলো,ছাত্রদল নোয়াখালী জেলা শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহীন ।জনাব রবিউল হোসেন কচি ভাই আজ বেঁচে নাই । তিনি ছিলেন আমার শ্রদ্ধাস্পদ একজন বড় ভাই । আমাকে খুব স্নেহ করতেন । আমি কখনো তাঁহার কাছে সাহায্য চাইতে যাই নাই । আমাকে বেশ কিছুদিন না দেখে আমার চাচা বিশিষ্ট সাংবাদিক জনাব নুরুল আমিনকে আমার খবরা খবর জানতে চাইলেন । চাচা সম্ভবত আমার ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার কাহিনী তাহাকে বলেছেন । কচি ভাই আমাকে একদিন তার সাথে দুপুরের খাবার খাওয়ার দাওয়াত দিলেন । আমি খবর পেয়ে উনার সাথে দেখা করতে গেলাম । আমাকে দেখে খুব আন্তরিক ভাবে সম্ভাষণ জানিয়ে পাশে বসালেন । কিছুক্ষণ পর আমাকে নিয়ে চলে গেলেন পাশের কামরায়,দুজনের জন্য দুপুরের খাবার আনতে পিয়নকে পাঠিয়ে দিলেন । দুপুরের খাবার খেতে খেতে আমার দুর্দশার কথা তাকে খুলে বললাম । আমাকে সান্তনা দিয়ে ধৈর্য ধারণ করার পরামর্শ দিলেন । এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী জনাব কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সাথে আমাকে নিয়ে দেখা করার প্রতিশ্রুতি দিলেন । পরবর্তী সপ্তাহে ঢাকা যাওয়ার সময় আমাকে সাথে নিয়ে ঢাকা গলেন । যথারিতি প্রধান প্রকৌশলীর সাথে দুজনে দেখাও করলাম।জনাব কামরুল ইসলাম বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বস্ত করলেন । কিন্তু দুই মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও চীফ ইঞ্জিনিয়ারের অফিস থেকে কোন সিদ্ধান্ত আসে নাই । লোকমুখে জানতে পারলাম হাতিয়ার সংসদ সদস্য জনাব ফজলুল আজিম সাহেব প্রধান প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর ভালো বন্ধু । শিক্ষা জীবনে দু’জন একই রুমমেট ছিলেন । মাহবুব আলমগীর আলোকে খুলে বললাম বিষয়টি । আলো শুনে সাহায্য করতে সম্মত হলো । আজিম সাহেবের সাথে আমার পূর্ব পরিচয় ছিলোনা । আলো এবং শাহীনকে নিয়ে ঢাকায় চলে গেলাম।
অনেক চেষ্টা তদবিরের পর অবশেষে জনাব ফজলুল আজিম সাহেবের স্বাক্ষাত পেলাম। তখন পবিত্র রমজান মাস , তিনি সন্ধ্যায় ইফতারের দাওয়াত দিলেন গুলশানে তার বাসায়। সন্ধ্যায় যথারীতি আমরা হাজির হলাম আজিম সাহেবের বাসায় ইফতারের টেবিলে বসেই ঘটনার বিস্তারিত আলোচনা করলাম। ধৈর্য ধরে মনোযোগ দিয়ে তিনি আমার সব কথা শুনলেন, এবং জনাব কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সাথে দেখা করতে সম্মত হলেন। আজিম সাহেব ব্যস্ত একজন মানুষ তখন সংসদ অধিবেশন চলছিল। প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা তার পিছনে লেগে থাকি। কখন তিনি আমাকে নিয়ে চীফ ইঞ্জিনিয়ারের অফিসে যাবেন। প্রায় এক মাস অপেক্ষার পর একদিন জানালেন পরের দিন সকাল ১০টায় কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সাথে স্বাক্ষাতের সময় পাওয়া গিয়েছে। সকালে খুব ভোরে উঠে আমরা তিন জন এলজিইডি অফিসে এসে হাজির হলাম। আজিম সাহেবও সময় মত এসে হাজির। কিন্তু দুর্ভাগ্য কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী বিশেষ প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ব্যস্ত থাকায় সময় মত অফিসে আসতে পারেন নাই। আজিম সাহেব ঘন্টা খানেক অপেক্ষা করে চলে গেলেন। ইতিমধ্যে ঈদের ছুটিতে অফিস বন্ধ হয়ে গেল। ব্যর্থ হয়ে নোয়াখালী চলে গেলাম। হাল ছাড়লাম না। ঈদের পর আবারো তিনজন ঢাকায় চলে গেলাম। শুরু হলো অপেক্ষার পালা। কখন আজিম সাহেব চীফ ইঞ্জিনিয়ারের সাথে স্বাক্ষাত করবেন। অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো। আমরা চীফ ইঞ্জিনিয়ারের সাথে দেখা করলাম। তিনি মনোযোগ দিয়ে সব শুনলেন।এবং এই অপরিণামদর্শী প্রকল্প গ্রহণ করায় পিডিকে ডেকে এনে কিছু কথা শুনিয়ে দিলেন। প্রকল্পটি নিয়ে এলজিইডি সারা দেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। পিডিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলেন। যেই লাউ সেই কদু ! আবারো অপেক্ষার পালা।মাসের পর মাস যায়। মাসের অধিকাংশ দিন আমি ঢাকায় পড়ে থাকি। আমার চলমান অন্যান্য কাজগুলো প্রায় বন্ধ। সময়মতো কাজ সমাপ্ত করতে না পারায় বার বার সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করছি।
একজন মানুষ যখন চরম হতাশা গ্রস্ত হয়ে পড়ে তখন সেই বিভিন্ন বাজে অভ্যাসের দিকে ধাবিত হয়। আমিতো আর কোন মনি ঋষি নয় ! রক্তে মাংসে গড়া মানুষ। আমিও ধীরে ধীরে সেই পথে হাঁটতে শুরু করলাম।
ইতিমধ্যে আমার দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সহকর্মী এবং বন্ধু মোবারক হোসেন আজাদ আমাকে সাহায্য করতে হাত বাড়িয়ে দিলো। আমার হতাশা এবং মানসিক শান্তনার জন্য বিভিন্ন ভাবে উপদেশ এবং সহমর্মিতা দেখালো। দীর্ঘ আলোচনার পর স্থির করলাম অতীত ভুলে আবার কাজে মনোযোগ দিতে হবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অর্থ আটকে পড়ে থাকায় এবং কাজের প্রতি অনীহা চলে আসায় বেশ কিছুদিন কোন টেন্ডারে অংশ গ্রহণ করা হয় না। দু’জনে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম আগামীতে যৌথ ভাবে ব্যবসা করবো। সেই মোতাবেক আমরা বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে টেন্ডার দিতে শুরু করলাম । ১৯৯৩ সালে লক্ষীপুর সড়ক বিভাগের অধীনে রামগঞ্জে একটি সড়কে প্রায় ১৫ লক্ষ টাকার মাটি ভরাটের একটি কাজ করে ছিলাম,কিন্তু কাজটির চুড়ান্ত বিল করি নাই । নোয়াখালী সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর সাথে আজাদের ভালো সম্পর্ক ছিলো । আজাদকে প্রস্তাব দিলাম কাজটি বর্ধিত করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর সাথে আলাপ করার জন্য ।
ছয় সাত বছর আগের কাজ তার পরও তত্ত্ববধায়ক প্রকৌশলী কাজটি আরো ৫লক্ষ টাকা বর্ধিত করতে সম্মত হলেন । যুক্তি হিসাবে তিনি ছয় বছর আগের দরপত্রের প্রাক্কলিত ব্যয় এবং বর্তমান প্রাক্কলিত ব্যয়ের মধ্যে পার্থক্যের কারণে সরকারের আর্থিক লাভের কথা উল্লেখ করে প্রস্তাবনা তৈরি করে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর কাছে পেশ করলেন । অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী প্রস্তাবটি অনুমোদন করে দিলেন । কথা ছিলো আজাদ এবং আমি যৌথ ভাবে পুঁজি বিনিয়োগ করে কাজটি করবো । কাজটি চলতি অবস্থায় নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে আজদের নামে খাল পূর্ণ খননের একটি কাজ এবং নোয়াখালী সড়ক বিভাগের অধীনে আমার নামে আরেকটি কাজ পেয়ে গেলাম । এই তিনটি কাজেই যৌথ বিনিয়োগ করে করার কথা । কিন্তু আমি কথামত সমপরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে ব্যর্থ হই । তার পরেও আজদ মহানুভবতা দেখিয়ে লাভের অংশ সমান ভাগে ভাগ করে দেয় ।
আকাশ থেকে হঠাৎ খসে পড়া নক্ষত্রের পতন যেমন নীচ থেকে ঠেকানো যায় ন। অসংখ্য সুহৃদ বন্ধু, শুভানুধ্যায়ীদের আন্তরিকতা এবং শত প্রচেষ্টা শর্তে ও আমার পতন ঠেকানো সম্ভব হয়নি। দিনে দিনে আমার মানসিক যন্ত্রণা এবং হতাশার পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে লাগল। সাথে সাথে আড্ডার পরিমাণও বৃদ্ধি পেতে লাগল। মদ্যপান এবং ক্লাবে বসে রাত দিন জুয়া খেলা আমার নিত্য নৈমিত্তিক কাজে পরিণত হলো। পারিবারিক অশান্তির পরিমাণ ও বৃদ্ধি পেল। মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেল, কেউ ভালো কথা বললেও আমি রাগ করতাম। এই দিকে পাওনাদাররা তাদের পাওনা পরিশোধের জন্য চাপ দিতে লাগলো।
দীর্ঘ একবছর চার মাস পর এলজিইডি আফিস থেকে আমাকে চিঠি দিয়ে জানানো হলে কাজটি পূর্ণ সংস্কার করে দেওয়ার জন্য । আমি নির্বাহী প্রকৌশলীর, এবং উপজেলা প্রকৌশলীর সাথে দেখা করতে গেলাম এবং তাদেরকে বুঝাতে চেষ্টা করলাম কাজটি এই মুহুর্তে পূর্ণ সংস্কার করা আমার পক্ষে কোন ভাবেই সম্ভব নয় । কিন্তু সবার একেই কথা কাজটি পূর্ণ সংস্কার না করলে তাদের কিছুই করার নাই । এই নিয়ে উভয়ের সাথে আমার চরম উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়ে গেল, উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের এক পর্যায়ে নির্বাহী প্রকৌশলী বলে বসলেন আমি যে কাজটি শেষ করেছি তার কি প্রমাণ আছে ? যেই আশঙ্কাটি আমি করে আসছি তাই বলে বসলো । আসলে আমার কাছে কোন প্রমাণইতো নেই । যেহেতু এমবিতে কোন রেকর্ড নাই ।এলজিইডির শক্ত অবস্থানের কারণ হলো কাজের মেজারমেন্ট বুকে কোন রেকর্ড নেই । হঠাৎ আমার মাথায় আসলো রোলারের লগ বই এর কথা । আমি বললাম আমি যে কাজ করেছি এমবিতে রেকর্ড নাই ঠিক, কিন্তু রোলারের লগ বই পরিক্ষা করলে দেখবেন কাজ করেছি কি করি নাই । আমার কাজের অনুকুলে যেই রোলার ইসু করা হয়েছিলো এলজিইডির নিয়ম অনুযায়ী রোলার ভাড়ার অংশিক টাকা অগ্রিম পরিশোধ করতে হয় । রোলার ড্রাইভার প্রতিদিন কি কাজ করেছে লগ বইতে উল্লেখ করতে হয় । এই হালকা যুক্তিতে যদিও প্রমাণ হয়না তার পরও আমি বিষটি নিয়ে ওদের সাথে জোরালো ভাবে তর্কবিতর্ক করে যাচ্ছি । শত চেষ্টা তদবির করেও কোন লাভ হলো না । শেষ পর্যন্ত প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা ব্যয় করে আবার কাজটি পূর্ণ সংস্কার করে দিতে হলো । কাজটি করতে গিয়ে যাদের কথা আমার বিশেষ ভাবে মনে পড়েছে তারা হলেন জনাব জসিম উদ্দিন , এবং চন্দন সেনের কথা । ইতিমধ্যে দু’জনই বদলী হয়ে কর্মস্থল নোয়াখালী ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গিয়েছে । হাতে থাকা অন্যান্য দপ্তরের কাজগুলি শেষ করার জন্য আমার প্রচুর নগদ টাকার প্রয়োজন হয়ে পড়ে । আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই দু’জন পাশে থাকলে আমাকে সাহায্য করতে কৃপনতা করতেন না।
অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে কাজ গুলি শেষ করেছি বটে । কিন্তু সময় মত কাজ সমাপ্ত করতে না পারায় কোন কাজেই লাভতো দুরের কথা পুঁজি ফেরৎও পেলাম না । এলজিইডির কাজেই লোকসানের পরিমানণ ছিলো প্রায় ৩০লক্ষ টাকার উপরে । এই ছাড়া কাজের ব্যাপারে দৌড়াদড়ি করে আরো কয়েক লক্ষ টাকা ক্ষতি হয়।
একে একে সব গুলি কাজে বিপুল অর্থ লোকসানের ফলে আমি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি । ধার দেনা পরিশোধ করে আমি চরম অর্থ সংকটে পড়ে যাই । অর্থ লোকসানের পাশাপাশি আমার ব্যবসায়িক সুনাম মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একদিকে আর্থিক লোকসান আন্যদিকে পারিবারিক কলহ মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পেতে থাকে । আমার অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের কারণে পারিবারিক কলহ চুড়ান্ত রুপ নেয়। বিশেষ করে আমার বাবা মায়ের বদ্ধ মূল ধারণা আমার উশৃঙ্খল জীবন ধারণ এবং অসৎ পথে অর্থ অপচয়ের ফলে এই দূরর্দশার জন্য দায়ী। আমি তাদেরকে কোন ভাবেই বুঝাতে পারলাম না, পূর্বে আমি এই রকম কখনো ছিলাম না। বাবা মায়ের সাথে মনোমালিন্য করে এক পর্যায়ে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে গেলাম।
বন্ধু হলো কখনো কখনো জীবনের আর্শিবাদ।একজন ভালো বন্ধু মানুষের জীবন চলার গতি প্রকৃতিকে পাল্টে দিতে পারে । কথায় বলে, বন্ধুত্বে যদি সত্যিই প্রাণের টান থাকে তবে ৫০বছরে কোন যোগাযোগ না থাকার পরে দেখা হলে বন্ধুরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। ইফতেখারুল কবির জুয়েল তাদেরমধ্যে অন্যতম একজন।খুব ছোট বেলা থেকে পরিচয়। এক সঙ্গে সরকারি আবাসিক এলাকায় থাকতাম পাশাপাশি বিল্ডিং এ।ওর বাবার বদলির সুত্রে মাঝে বেশ কয়েক বছর দূরে ছিল। আবার যখন ফিরে এলো তখন একেবারে প্রতিবেশী হয়ে ফিরে এলো। দু’জনের মধ্যে সৌহার্দ্যের সম্পর্ক আবারো গড়ে ওঠে। সার্বক্ষণিক সঙ্গি হিসেবে চলতে থাকি অনেক দিন। সময়ের প্রয়োজনে এক সময় সে ঢাকায় চলে যায়, আমিও কর্ম জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ি ।দু’জনের মাঝে অনেক দিন কোন যোগাযোগ ছিলনা । সে নোয়াখালী আসলে চলার পথে কখনো দেখা হলে কথা হতো ।এর বেশী তেমন যোগাযোগ ছিলনা।
বাড়ি থেকে অভিমান করে সোজা ঢাকায় চলে গেলাম।
ঢাকায় হোটেল বসে বসে চিন্তা করতে লাগলাম কি করা যায়, কার সহযোগিতা নেওয়া যায়। কেন জানি হঠাৎ জুয়েলের কথা মনে পড়ে গেল ! নীচে গিয়ে জুয়েলের মোবাইল নাম্বারে ফোন দিলাম। ভাগ্য ভালো একদিন জুয়েল মোবাইল নাম্বারটা দিয়েছিলো। ফোন রিসিভ করার পর নাম বলতেই কোথায় আছি? কেমন আছি জানতে চাইলো।কুশলাদি বিনিময়ের পর আমি তার সাথে দেখা করতে চাই বললাম। জুয়েল অফিসের ঠিকানা দিলো পরের দিন দেখা করার জন্য। গভীর রাত পর্যন্ত চিন্তা করলাম জুয়েলকে কি বলবো?
অথৈই সমুদ্রে পড়ে মানুষ যেমন খড় কুটো ধরে বাঁচাতে চায় আমিও অনেক চিন্তা করে ঠিক করলাম আমাকে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করবো। জুয়েল তখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জিএম হিসেবে কাজ করে। পরের দিন ছিল বাংলা নববর্ষ। জুয়েলের দেওয়া ঠিকানা মত তার অফিসে চলে গেলাম। অনেক দিন পর দেখা, উঠে এসে বুকে জড়িয়ে নিলো।অনেক্ষণ অফিসে আড্ডা দিয়ে দুপুরে খাওয়া খেতে গুলশানে ধানসিঁড়ি রেস্টুরেন্টে চলে গেলাম দু’জনে।খাওয়ার টেবিলে বসেই ঘটনার বিস্তারিত তাকে খুলে বললাম। দীর্ঘ আলোচনার পর শেষে হোটেল থেকে বের হয়ে আমরা দু’জন রিক্সা নিয়ে উদ্দ্যেশ্যহীন ভাবে সেই দিন অনেকক্ষণ ঘুরেছি।রিক্সায় এই প্রসঙ্গে আর কোন আলোচনাই হলোনা। সন্ধ্যার পর আবার তার অফিসে বসে আড্ডা দিতে লাগলাম, অনেক রাত পর্যন্ত জুয়েলের সাথে আড্ডা দিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম। পরে দিন যথারীতি আবার ওর অফিসে গেলাম সারাদিন আড্ডা দিয়ে দুপুরের খাবার খেতে আজ জুয়েলের বাসায় গেলাম,ওর বাসা তখন রামপুরা। বিকেলে আজও রিক্সা নিয়ে উদ্দ্যেশ্যহীন ভাবে ঢাকা শহরের অনেক অলিগলিতে ঘুরেছি।অতীতের অনেক গল্প করলাম দু’জন।নোয়াখালীতে আমরা একসাথে একই রাজনৈতিক দল করতাম, দু’জন চৌমুহনী কলেজে পড়াশোনা করতাম। কলেজ জীবনের অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা, রাজনৈতিক জীবনের নানান ঘটনা ছিলো আলোচনার বিষয় বস্ত। সময় ফেলে রিক্সা নিয়ে উদ্দ্যেশ্যহীন ভাবে ঘুরাঘুরি আর অফিসে বসে বসে আড্ডা দেয়া আমার নিত্য নৈমিত্তিক কাজে পরিণত হলো।সময়ে সময়ে আমার পকেট খরচ থেকে শুরু করে খাওয়া দাওয়া সব কিছু তখন সেই করছে। প্রায় পনেরো দিন পর জুয়েল জিজ্ঞেস করলো, এখন কি করবি চিন্তা করলি ? আমি নিঃসংকোচে আমর অভিপ্রায়ের কথা খুলে বললাম। অর্থাৎ এই মূহুর্তে আমার একটি চাকরির বিশেষ প্রয়োজন। আমরা কথা শুনে জুয়েল একটু হাসলো। বললো তাহলে চাকরি করবে ঠিক করেছ? এই বলে আবারো অন্য প্রসঙ্গে আলোচনা করতে লাগল। পরে দিন জুয়েলের বাসায় গেলাম রাতে সেখানে ছিলাম। অনেক আলোচনার পর জুয়েল বললো, দেখ যেখানে শেষ সেখান থেকে তোকে আবার শুরু করতে হবে। আমি বললাম এখন আর সম্ভব নয়। আমার আর এই ব্যাবসা করতে ইচ্ছে করে না। ঠিকাদারি ব্যাবসার প্রতি আমার বিতৃষ্ণা চলে এসেছে।জুয়েল বললো আমি ইচ্ছা করলে তোমাকে একটা চাকরি জোগাড় করে দিতে পারি। কিন্তু আমি চাইনা তুমি চাকরি কর। আমি চাই তুমি আবার ব্যবসা শুরু কর। এর পর সারা রাত এই বিষয়ে অনেক আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হলো আবার টেন্ডার দেওয়ার। আমার সড়ক ও জনপথ বিভাগের লাইসেন্স দিয়ে সারা দেশে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকার একক টেন্ডারে অংশ গ্রহণ করার যোগ্যতা আছে। সিদ্ধান্ত হলো এক সপ্তাহের মধ্যে কোথাও একটি বাসাভাড়া নিয়ে সেখানে উঠার। আলোচনা মত নোয়াখালী থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে এসে ঢাকায় আরামবাগে একটা বাসায় উঠলাম। মে মাস থেকে সড়ক বিভাগে সাধারণত টেন্ডার আহ্বান করা শুরু হয়। ঢাকা সহ সারা দেশে টেন্ডারে অংশ গ্রহণ করা শুরু করলাম। মে মাস থেকে শুরু করে জুলাই মাস পর্যন্ত সারা দেশে কয়েকশ টেন্ডারে অংশ গ্রহণ বাবদ সিডিউল ক্রয় করে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা খরচ করেও দুর্ভাগ্যজনক ভাবে কোথাও লটারিতে কোন কাজ ফেলাম না । শুধু সিডিউল নয় যেই সব জেলায় টেন্ডারে অংশ গ্রহণ করেছি প্রতি দিনই কোন না কোন জেলায় লটারিতে স্বশরীরে উপস্থিত থাকতে গিয়ে যাতায়ত, থাকা খাওয়া সহ আরো অনেক টাকা খরচ করতে হয়েছে । এই খাতে সমস্ত অর্থই জুয়েল ব্যয় করেছে । (চলমান)