সময়ের সবচেয়ে আলোচিত আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস শব্দটি এসেছে নাকি ল্যাটিন ভাষা থেকে। ল্যাটিন শব্দ CORONA (করোনা) যার অর্থ “মুকুট”।
গুগল ট্রান্সলেটে অনুসন্ধান করলে দেখা CORONA শব্দের দুটি অর্থ “পুস্প মুকুট” এবং “সৌর মুকুট”।

দ্বিমাত্রিক সঞ্চালন ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ভাইরাসটির আবরণ থেকে গদা-আকৃতির প্রোটিনের কাঁটা গুলির কারণে এটিকে অনেকটা মুকুটের মত দেখা যায় বলে বিজ্ঞানীরা একে ‘সৌর মুকুট’ নামে অবহিত করেন।

ভাইরাসের উপরিভাগ প্রোটিন সমৃদ্ধ থাকে যা ভাইরাল স্পাইক পেপলোমার দ্বারা এর অঙ্গসংস্থান গঠন করে। এ প্রোটিন সংক্রমিত হওয়া টিস্যু বিনষ্ট করে। ভাইরাসটি ডাইমরফিজম রুপ প্রকাশ করে।
ধারনা করা হয়, করোনা ভাইরাস মূলত স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখিদের মাধ্যমে প্রথম মানবদেহে প্রবেশ করে।
মানুষের মধ্যে করোনা ভাইরাস শ্বাসনালীর সংক্রমণ ঘটায় সবচেয়ে বেশি।

করোনা ভাইরাস ১৯৬০-এর দশকে প্রথম আবিষ্কৃত হয়। প্রথমদিকে মুরগির মধ্যে সংক্রামক ব্রঙ্কাইটিস ভাইরাস হিসেবে এটি প্রথম দেখা যায়। পরে সাধারণ সর্দি-হাঁচি-কাশিতে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে এরকম দুই ধরনের ভাইরাস পাওয়া যায়।
মানুষের মধ্যে পাওয়া ভাইরাস দুটি ‘মনুষ্য করোনা ভাইরাস-২২৯ই’ এবং ‘মনুষ্য করোনাভাইরাস ওসি-৪৩’ নামে নামকরণ করা হয়।
এরপর থেকে বিভিন্ন সময় ভাইরাসটির আরো বেশ কিছু প্রজাতি পাওয়া যায় যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ২০০৩ সালে ‘SARS-COV’,২০০৪ সালে’HCOV-NL-63’, ২০০৫ সালে ‘HKU-1’, ২০১২ সালে’ MERS-COV’ এবং সর্বশেষ ২০১৯ সাল চীনে পাওয়া যায় যা বর্তমানে সাধারণত নোভেল করোনাভাইরাস নামেই পরিচিত। এগুলোর মধ্যে অধিকাংশ ভাইরাসের ফলে শ্বাসকষ্টের গুরুতর সংক্রমণ দেখা দেয়।

২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে করোনা ভাইরাসের একটি প্রজাতির সংক্রামণ দেখা দেয়। প্রথমদিকে নতুন এই রোগ টিকে নানা নামে ডাকা হয়।
যেমন ‘চায়না ভাইরাস’ , ‘রহস্য ভাইরাস’, ‘এনকভ-২০১৯’, ‘করোনা ভাইরাস’, ‘নতুন ভাইরাস’, ইত্যাদি। পরে এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভাইরাসটিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘NCOV’ – ২০১৯ নামকরণ করে। যা কোভিড-১৯ নামে সর্বাধিক পরিচিত। কোভিড নেয়া হয়েছে করোনা থেকে ‘কো’ , ভাইরাস থেকে ‘ভি’, এবং ‘ডিজিজ’ বা ‘রোগ’ থেকে ‘ডি’ নিয়ে এর সংক্ষিপ্ত নামকরণ করা হয় কোভিড-১৯।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড ১৯-কে মহামারী হিসাবে উল্লেখ করেছে। বিশ্বমারী করোনার প্রাদুর্ভাব ইতিমধ্যে পৃথিবীর সব কয়টি মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে ।
কোভিড-১৯-কে মহামারী হিসাবে চিহ্নিত করার অর্থ এই নয় যে এই ভাইরাসের ভয়াবহতা বেড়েছে। মূলত এর ভৌগলিক বিস্তারের স্বীকৃতিস্বরূপ একে মহামারী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
৩১ মার্চ পর্যন্ত সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ সহ বিশ্বের ১৯০টিরও বেশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৮, ০০০৪৯ -এরও অধিক মানুষ করোনা ভাইরাস রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলে সংবাদ পাওয়া গিয়েছে। এদের মধ্যে ৩৮,৭১৪ জনের বেশী মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ সুস্থ হয়ে উঠেছেন বলে জানা যায়।

সকল প্রকার করোনা ভাইরাসের সর্বশেষ সাধারণ পূর্বপুরুষের উৎপত্তি ঘটে আনুমানিক ৮০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। আলফাকরোনা ভাইরাসের এমআরসিএ ধারা ২৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, বেটাকরোনা ভাইরাসের ধারা ৩৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, গামাকরোনা ভাইরাসের ধারা ২৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এবং ডেল্টাকরোনা ভাইরাসের ধারা ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তৈরি হয়েছে।
বাদুর এবং পাখির মত উড়ন্ত উষ্ণরক্তধারী মেরুদণ্ডী প্রাণীরাই করোনা ভাইরাস জিন-উৎসের বিবর্তন এবং ছড়িয়ে দেওয়ার অদর্শ বাহক। এদের মধ্যে বাদুড়ের জন্য আলফা ও বেটাকরোনা ভাইরাস,এবং পাখির জন্য গামা ও ডেল্টাকরোনা ভাইরাস বাহক হিসেবে কাজ করে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মতে নির্দিষ্ট কোনও বয়স নয়, যে কোনও বয়সের লোকের করোনাভাইরাস হতে পারে। আগে থেকে অসুস্থ থাকলে আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে করোনা।

গরম, আপেক্ষিক আর্দ্রতা বেশি এমন এলাকাতেও করোনার জীবাণু ছড়াতে পারে। গরমে জীবাণু মরে যায় এমন কোনও স্পষ্ট প্রমাণ নেই।

ঠাণ্ডা ও তুষারপাতে করোনা কমে না।

গরম জলে স্নান করলে করোনার জীবাণু মরে যায় না।

করোনার জীবাণু মারতে হ্যান্ড ড্রায়ার কোনও উপায় নয়।

স্টেরিলাইজেশনের জন্য অত বেগুনি রশ্মি ব্যবহার করবেন না। এতে ত্বকে জ্বালা হতে পারে।

কারও জ্বর থাকলে থার্মাল স্ক্যানারে বোঝা সম্ভব। কিন্তু সেই জ্বর করোনাভাইরাস কিনা বোঝা সম্ভব নয়।

সারা শরীরে অ্যালকোহল বা ক্লোরিন ছেটালে শরীরে ইতিমধ্যেই ঢুকে যাওয়া করোনার জীবাণু মরবে না।

নিউমোনিয়া বা এ ধরনের জ্বরের কোনও টিকা নেওয়া থাকলে করোনা হবে না এমন ভাবা ঠিক নয়।

নাকে নিয়মিত স্যালাইন ঘষলে করোনা সংক্রমণ রোখা যাবে এমনটা নয়।

রসুন শরীরের পক্ষে উপকারী ঠিকই কন্তু তাতে করোনা আটকানোর কোনও প্রমাণ নেই।

জীবাণুর ওপর অ্যান্টবায়োটিক কাজ করে না, করে ব্যাকটিরিয়ার ওপর।

করোনার প্রতিষেধক হিসেবে এখনও কোনও ওষুধ আবিষ্কার হয়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ভাইরাসটির ইনকিউবেশন পিরিয়ড ১৪দিন পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। তবে কিছু কিছু গবেষকের মতে এর স্থায়িত্ব ২৪দিন পর্যন্ত থাকতে পারে।

করোনা সম্পর্কে চমকপ্রদ ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন
মার্কিন লেখিকা সিলভিয়া ব্রাউন যিনি একযুগ আগে একটি বই লিখেছিলেন।বইয়ের নাম ‘ইনড অব দ্যা ডে – প্রেডিকশন অ্যান্ড প্রোফেসি’ বইটিতে ১২ বছর আগে একটি ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করে ছিলেন তিনি। ওই বইয়ে তিনি লিখেন, ২০২০ সালের দিকে সারা বিশ্বে একটি ভাইরাস মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়বে।
১২ বছর আগের করা তার ভবিষ্যৎ বাণী হুবহু মিলে গেল। সিলভিয়া ব্রাউনের ভবিষ্যৎ বাণীটি মিথ্যা নয়। বইটি নিয়ে বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলোচনার ঝড় উঠেছে।
বইটির লেখিকা উল্লেখ করেন , ‘২০২০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে অসুস্থতার মতো মারাত্মক নিউমোনিয়া ছড়িয়ে পড়বে, ফুসফুস এবং ব্রোঙ্কিয়াল টিউবগুলোতে আক্রমণ করবে এবং সমস্ত চিকিৎসা পুনর্বিবেচনা করবে।’
তিনি আরও যোগ করেছেন, অসুস্থতার চেয়ে প্রায় হতবাক হওয়ার বিষয়টি হলো এটি হঠাৎ করেই আসার সাথে সঙ্গে সঙ্গে আবার অদৃশ্য হয়ে যাবে। ১০ বছর পরে আবার আক্রমণ করবে এবং তারপরে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যাবে।

করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক হিসেবে এখনো স্বীকৃত কোনো ভ্যাকসিন আবিষ্কার না হওয়ায় এর প্রতিরোধ সম্ভব হচ্ছে না। তাই সতর্কতাই এ ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায়।
সংক্রমণ ঠেকাতে মানুষে-মানুষে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে যে কোন ভাবে।

এ কে এম বেলায়েত হোসেন কাজল।