অতৃপ্ত আত্মার বিদায় এবং ঘটনা বহুল রাজনৈতিক জীবনের কিছু অংশ।

বিশ্বমারী করোনা আতঙ্কের মধ্যে দিয়ে নীরবে নিভৃতে দু’দিন আগে চলে গেল সাবেক সফল রাষ্ট্রপতি মরহুম হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের ৯০ তম জন্মদিন।
আজ ২৩শে মার্চ মাত্র একদিন পর পূর্ণ হতে যাচ্ছে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণের ৩৮ তম বৎসর।
১৯৮২ সালের ২৪ শে মার্চ এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ।

“দেশের মানুষ যেদিকে তাকাবে সেদিকে আমার উন্নয়নের ছোঁয়া দেখতে পাবে এদেশের মানুষ।”
এই কথাটি যিনি বলেছিলেন তিনি হচ্ছেন পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ।

ক্ষমতা গ্রহণ করেই যিনি বলেছিলেন ”৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে।” বাংলার মানুষ তাই তাকে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে পল্লীবন্ধু উপাধি দিয়েছিল ।
তিনি নতুন এক শ্লোগান চালু করেছিলেন, সেটি ছিল ”নতুন বাংলাদেশ, গড়ব মোরা…।”

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দক্ষ এবং সফল রাষ্ট্র নায়ক, নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নদ্রষ্টা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। যদিও তার দেশ পরিচালনাকে অনেকেই সামরিক একনায়কতন্ত্রের সাথে তুলনা করেন। তারপরও সুদীর্ঘ ৯ বছর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান থাকা কালে বেশ কিছু যুগান্তকারি পদক্ষেপ নেন তিনি।
সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ক্রীড়া এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তার নেয়া কার্যক্রম ও সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ড দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বাংলাদেশের ইতিহাসে ।

তিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের ঘুনেধরা প্রশাসন ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে দিয়ে যুগপযোগি প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন।
মহকুমাগুলোকে জেলায় উন্নীত করার মাধ্যমে দেশে ৬৪ জেলায় রূপান্তরিত করেন , উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তন করে দেশের ৪৬০টি থানাকে উপজেলায় উন্নীত করেন তিনি । উপজেলা গুলোকে স্থানীয় সরকারের উন্নয়নে কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উন্নীত করার মাধ্যমে বিকেন্দ্রীকরণের এই ধারণাকে বাস্তব রূপ দেন তিনি। নারীসমাজের আর্থ-সামাজিক স্বার্থ সমুন্নত রাখতে এরশাদ দেশে একটি পৃথক মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর স্থাপন করে। বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানি গুলোকে বাদ দিয়ে দেশীয় শিল্পের মাধ্যমে ঔষধ প্রস্তুত এবং অপ্রয়োজনীয় ঔষধ উৎপাদন এবং আমদানি নিষিদ্ধ করে জাতীয় ঔষধনীতি প্রণয়ন এবং জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ঘোষণা করেন তিনি। এরশাদ সরকার দেশে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ভূমি সংস্কারেরও প্রয়াস চালান।১৯৮৪ সালে ভূমি সংস্কার আইন প্রণয়ন করেন তিনি। ভূমিহীন, প্রায়-ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষীদের মধ্যে খাসজমি বিতরণ, অপারেশন ঠিকানা’ কর্মসূচির আওতায় সরকারি জমিতে ভূমিহীনদের জন্য গুচ্ছ-গ্রাম প্রতিষ্ঠা করেন এরশাদ । অসহায় গরিব দুঃখিদের মধ্যে ন্যায্য মূল্যে পল্লী রেশনীং ব্যবস্থা চালু করেন। মৎস্য ও চিংড়ি চাষের জমির সর্বোত্তম ব্যবহার জন্য জাল যার জলাশয় তার প্রথা চালু করেন।
সকল ধর্ম পালনে পূর্ণ স্বাধীনতা রেখে ৯৫ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত দেশে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন। শুক্রবারকে সাপ্তাহিক ছুটি ঘোষণা তিনি। উপাসনালয় ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ ও পানির বিল মওকুফ করেন তিনি , পহেলা বৈশাখকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা হয় , বিচার ব্যবস্থা দ্রুত করণের লক্ষ্যে ঢাকার বাইরে হাইকোর্ট বেঞ্চ বসিয়ে এরশাদ উচ্চতর আদালত বিকেন্দ্রীকরণেরও প্রয়াস চালান তিনি , কিন্তু বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে পরে তা খারিজ হয়ে যায়।তিনি উপজেলা পর্যায়ে মুন্সেফ কোর্ট স্থাপন করেন। জাতিসংঘে সেনাবাহিনীর প্রেরণ করেন তিনি ,এরশাদ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পের বিরাষ্ট্রীয়করণ এবং দেশে ব্যক্তিখাতের বিকাশে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন । বেসরকারি পর্যায়ে শিল্প স্থাপনে উদ্যোগ গ্রহণে ১৯৮৬ সালে তিনি শিল্পনীতি ঘোষণা করেন। বিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে বিনিয়োগ বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন।এরশাদের আমলেই গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশ ঘটে।
এরশাদের একটি বড় সাফল্য ছিল দক্ষিণ এশীয় সহযোগীতা সংস্থা সার্ক গঠনে উদ্যোগী হওয়া। ভারতীয় উপমহাদেশের সাতটি রাষ্ট্রকে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ফোরাম সার্ক গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি।
তাঁর অন্যান্য সৃজনশীল প্রয়াসের মধ্যে আরেকটি ছিল পথশিশুদের প্রয়োজন মেটাতে ‘পথকলি ট্রাস্ট’ গঠন।
এই ছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণ, সার্বজনীন বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন, প্রতিটি জেলায় উপজেলায় সরকারি স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক স্বার্থের উর্ধ্বে বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমানের নামে হোস্টেল নির্মাণ, মুজিব নগরে স্বাধীনতা স্মৃতি সৌধ নির্মাণ,জেলা উপজেলা পর্যায়ে স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের জন্য গাড়ি প্রদান, খেলাধুলার মান উন্নয়নের জন্য বিকেএসপি প্রতিষ্ঠা করেন এরশাদ। যার সুফল এখন ক্রীড়া ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখছে। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে হাজার হাজার কিলোমিটার রাস্তা তৈরি , পোল, কালভার্ট, ব্রিজ নির্মাণ, বুড়িগঙ্গা সেতু নির্মাণ, মেঘনা ও মেঘনা-গোমতী সেতু নির্মাণ, বন্যার কবল থেকে ঢাকাকে রক্ষার জন্য ডিএনডি বাঁধ নির্মাণ, দেশের সর্ব প্রথম বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেন চালু করণ সহ ১৯৮২ থেকে ৯০ সালে গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগের আগ পর্যন্ত অসংখ্য অসংখ্য উন্নয়ন এবং সংস্কার মূলক কাজ করে এরশাদ দেশের লক্ষ কোটি জনতার মনজয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন ।

রাজনৈতিক জীবনে দুই দফায় সাড়ে ছয় বছর করাভোগ করতে হয়েছিল জন নন্দিত নেতা এরশাদকে।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তিন জোটের রূপরেখা বাস্তবায়নের অজুহাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তাকে প্রথম দফায় গ্রেফতার করে জেলে ঢোকায়।

এরশাদ সরকারের পতনের পর তিনি জেলে গিয়েও সবদলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে নিজে পাঁচটি আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন।
গণআন্দোলনের মুখে সরকারের পতন এবং তার পদত্যাগের পরেও সেই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি রংপুর সহ সারা দেশে ৩৫টি আসন জয় লাভ করে ভোটের রাজনীতিতে একটা প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়।

৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণ করে এরশাদের বিরুদ্ধে অবৈধ ভাবে ক্ষমতা গ্রহণ, রাষ্ট্রীয় কেনাকাটায় দুর্নীতি, হত্যা মামলা সহ কয়েক ডজন মামলা দায়ের করে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইরাকের প্রেসিডেন্টের দেওয়া উপহার সামগ্রী রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না রাখার অভিযোগে এরশাদের তিন বছরের সাজা হয়।

পরে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকার গঠনে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। ৯৬ সালে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি এরশাদের ৫টি সহ সারা দেশে ৩২ টি আসনে জয় লাভ করে যে কোন দলের সরকার গঠনে নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে।

এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬ টি এবং বিএনপি ১১৬ টি আসনে জয় লাভ করে। জাতীয় পার্টি ৩২টি এবং জাসদের ১ টি ও স্বতন্ত্র একজন সংসদ সদস্যের সমর্থনে আওয়ামী লীগকে ঠেকিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা এবং দেন দরবার চালায়।
আওয়ামী লীগ যেন কোন অবস্থাতেই সরকার গঠন করতে না পারে অবশেষে জাতীয় পার্টিকে তাদের সমর্থনে সরকার গঠনের জন্য প্রস্তাব করে।

এরশাদের অনুপস্থিতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এক সময়ে আওয়ামী লীগ ঘরানার অন্যতম নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী এবং মহাসচিব আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর হস্তক্ষেপে আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনে সমর্থন দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
২১ বছর পর আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টির সমর্থনে সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টি এবং জাসদকে নিয়ে ঐক্যমতের সরকার গঠন করে ।

সরকার গঠনে আওয়ামী লীগকে সমর্থন এবং ঐক্যমতের সরকারে যোগ দেওয়ায় অল্প কিছুদিনের মধ্যে সবকটি মামলা থেকে জামিন পেয়ে এরশাদ কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন।

কারা প্রকোষ্ট থেকে মুক্তি পেয়ে এরশাদ দলকে গুছিয়ে নতুন আঙ্গিকে হিংসা, হানাহানির রাজনীতি পরিহার করে সুষ্ঠু স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধির রাজনীতি শুরু করেন ।

কিন্তু তার বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভিন্ন রাজনৈতিক হয়রানি মূলক মামলার কারণে এরশাদ কখনো স্বাধীন অবস্থান নিয়ে রাজনীতি করতে পারেননি।
মামলার ভয়ভীতি দেখিয়ে বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন সময়ে তাকে বিভিন্ন ভাবে হেনস্থা করে নিজেদের পক্ষে রাখতে বা বার বার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছেন। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ এরশাদের বিরুদ্ধে এই অস্ত্রটি বেশি বেশি প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির নেতৃত্বে চরদলীয় জোট গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় এবং সরকার থেকে জাতীয় পার্টির সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়ার অপরাধে তৎকালীন হাইকোর্টের বিচারপতি লতিফুর রহমানকে দিয়ে আদালতে জনতা টাওয়ার মামলার রায় পরিবর্তনের ঐতিহাসিক ক্যাসেট কেলেঙ্কারির কথা এখনকার নবীন রাজনৈতিক নেতা কর্মীরা না জানলেও নব্বইয়ের দশকের রাজনৈতিক নেতা কর্মী বা দেশের সাধারণ মানুষ নিশ্চয়ই ভুলে যায়নি।
এরশাদকে পরবর্তী নির্বাচনে অযোগ্য করার জন্য পাঁচ বছরের জেল এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করে দ্বিতীয় দফায় জেলে প্রেরণ করা হয়। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে দিয়ে জাতীয় পার্টিকে প্রথম দ্বিখণ্ডিত করা হয়। এরশাদ সমর্থন প্রত্যাহার করায় আনোয়ার হোসেন মঞ্জর নেতৃত্বে ছোট্ট একটি অংশ সরকারের সাথে থেকে যায়

২০০১ সালে বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্ববধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে শোচনীয় ভাবে পরাজিত করে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার।

যদিও আওয়ামী লীগ স্থুল কারচুপির অভিযোগ তুলে এই নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখান করে।
আওয়ামী লীগের দাবি ছিল নির্বাচনের ফলাফল আগেই নির্ধারিত হয়ে ছিল। আওয়ামী লীগ ভারতের কাছে গ্যাস বিক্রি করতে রাজি না হওয়ায়, আমেরিকার একজন সাবেক প্রেসিডেন্টের মধ্যস্থতায় ক্ষমতায় গেলে ভারতের কাছে গ্যাস বিক্রির মুচেলেকা দিয়ে গোপন চুক্তি সম্পাদন করে বিএনপি।
ভারতের সহযোগিতায় কৌশলে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট নির্বাচনে জয় লাভ করে ।

২০০৬ সালের অক্টোবরের শেষের দিকে যখন বিএনপি জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে আসছিল।
সংবিধান অনুযায়ী মেয়াদ শেষে কোন দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থেকে নির্বাচনী প্রক্রিয়া তদারকি করবে এবং তাদের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে জোট সরকার নিজেদের পছন্দের লোককে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিযুক্ত করার অভিপ্রায়ে একজন প্রধান বিচারপতির চাকরির অবসরে যাওয়ার বয়স বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে এর বিরুদ্ধে সব রাজনৈতিক দল তীব্র প্রতিবাদ করে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে।

ইতিমধ্যে জোটের রাজনীতির সুফল বুঝতে পেরে ২০০৬ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে নানা নাটকীয়তার পর জাতীয় পার্টিকে নিয়ে আওয়ামী লীগ মহাজোট গঠন করে । এবং ইসলামী ঐক্যজোটের সাথে গোপনে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে আওয়ামী লীগ । এ চুক্তির উল্লেখযোগ্য একটি ধারা ছিল আওয়ামী লীগ আগামীতে ক্ষমতায় গেলে দেশে কুরআন – সুন্নাহ বিরোধী কোন আইন প্রণয়ন করা হবে না বলে আওয়ামী লীগ অঙ্গীকার করে ।

বিরোধী দলের তীব্র প্রতিবাদের মুখে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করলে দেশে রাজনৈতিক সংকটের সৃষ্টি হয়।
ইয়াজউদ্দিনের অন্তর্বর্তী সরকারের সূচনা হয় তীব্র আন্দোলন এবং সহিংস ভিক্ষাভের মধ্যে দিয়ে।

রাজপথ আওয়ামী লীগের দখলে রেখে দলের নেতা কর্মীরা লগি বৈঠা নিয়ে পুরো ঢাকা শহর অবরুদ্ধ করে ভিক্ষাভ প্রদর্শন করতে থাকে ।
চারদলীয় জোট সরকারের ৫ বৎসর পূর্তি উপলক্ষে ২৮শে অক্টোবর পল্টনে জামায়াতে ইসলামীর সমাবেশ শেষে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বেধে যায়। আওয়ামী লীগ কর্মীদের লগি বৈঠার নিষ্ঠুর নির্যাতনের আঘাতে জামায়াতের ছয় সাতজন নেতা কর্মী নির্মম ভাবে নিহত হয়। আহত হয় কয়েকশো নেতাকর্মী।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নে সমগ্র দেশ জুড়ে ভয়াবহ রাজনৈতিক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বেশ কিছুদিন অব্যাহত ছিল এই সহিংসতা ।
মূলত এই সহিংসতার পথ ধরেই ১/১১ সৃষ্টি হয়েছিল। দেশের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে চরম বিপর্যয় ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে অসাংবিধানিক সেনা সমর্থিত কথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে।

কেবল সুষ্ঠু নির্বাচনের দায়িত্ব নিয়ে ক্ষমতায় এলেও ১/১১ সরকার চেষ্টা করেছিল বৈরীভাবাপন্ন দুই নেত্রীকে বাদ দিয়ে দেশে সুষ্ঠুধারার নতুন একটি রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি করতে ৷ সেই লক্ষ্যে নোবেল জয়ী ডঃ মুহাম্মদ ইউনূস কে দিয়ে সামনে এগোতে চেষ্টা করেছিল।
পরবর্তী সময়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার জন্মদিয়ে আন্দোলনের মুখে দু`বছরের মাথায় সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই নেত্রীকে কারামুক্ত করে ২০০৮এর ২৯শে ডিসেম্বর নির্বাচন দিলে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।
২০০৯ এর ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দ্বিতীয়বারের মত সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট ।
৪৫ সদস্যের বিশাল মন্ত্রী সভায় মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির একজন এবং চৌদ্দদলের একজন প্রতিনিধি ছিল। এই সময়ে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যে উর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে , সন্ত্রাস দমন, আইন-শৃঙ্খলা চরম অবনতি, বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড বৃদ্ধি , মন্ত্রী-এমপিদের সীমাহীন দূর্নীতি, রাজধানীর যানজট নিরসনসহ ছাড়াও নির্বাচনের পূর্বে নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতির অর্ধিকাংশই পূরণ করতে ব্যর্থ হয় মহাজোট সরকার।
মহাজোট সরকারের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজের দরপত্র প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সেতু নির্মাণের জন্য ঋণদাতা সংস্থা বিশব্যাংক ঋণ স্থগিত করে। সেই সঙ্গে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক আর জাইকা ও ঋণ সহায়তা বন্ধ করে দেয়। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন এবং সচিবকে মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়েও দেওয়া হয়।
নিজেদের পরবর্তী নির্বাচনের ফলাফল আঁচ করতে পেরে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে দুরভিসন্ধিমূলক ভাবে
আদালতের দোহাই দিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেওয়া হয়।
সাধারণ নির্বাচন কালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে বিএনপির আন্দোলনের ডাক দেয়।
একটি নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৯৯৪-৯৬ সালে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে।
আন্দোলনে শুধু দিনের পর দিন হরতাল, ঘেরাও, অবরোধ, অসহযোগ নয়- ট্রেন-বাস-তেলবাহী জাহাজ জ্বালিয়ে দেয়া, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে বোমা হামলা ও আগুন দেয়া, থানা আক্রমণ, সরকারি কর্মচারীদের উলঙ্গ করা, গার্মেন্ট তরুণীদের লাঞ্ছিত করা প্রভৃতি অসংখ্য সহিংস ঘটনা সংঘটিত হয় সেই আন্দোলন চলা কালে।

৯৪-৯৬ এর আদলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি তদ্রুপ একটি সহিংস আন্দোলন গড়ে তুলতে চেষ্টা করে। ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর দশম সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন থেকে টানা আন্দোলন শুরু করে বিএনপি। মাঝখানে এক বা দুই দিনের বিরতি দিয়ে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় দফা অবরোধ চলে সারাদেশে। এর মধ্যে ২৬ নভেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত হরতাল-অবরোধে সহিংসতায় ৭৫ জন সাধারণ মানুষ প্রাণ হারায়।

২০১৪ এর ৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের আগে জাতিসংঘের তখনকার রাজনীতি বিষয়ক সহকারি মহাসচিব ফার্নান্দেজ তারানকো বাংলাদেশে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দুই পক্ষের একগুয়েমির কারণে তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এর আগে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব বান কি মুন দুই দলের নেত্রী শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার কাছে চিঠি দিয়ে আলোচনায় বসে সমস্যার সমাধানের জন্য অনুরোধ করছিলেন।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে আলোচিত দল ছিল জাতীয় পার্টি এবং এর চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ । দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্যান্য রাজনৈতিক দল অংশ গ্রহণ না করলে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেয়।
এই ঘোষণা পরে নাটকীয়ভাবে অস্ত্রের মুখে বাসা থেকে তুলে নিয়ে এরশাদকে র‌্যাব সিএমএইচে ভর্তি করায়। র‌্যাব তখন তার অসুস্থতার কথা বললেও জাতীয় পার্টির নেতারা এবং তার পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় , তাদের চেয়ারম্যান অসুস্থ ছিলেন না তাকে জোর করে বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে।

২০১৪ সালে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস। ঐ সময় কংগ্রেস সরকার দুতিয়ালি করার জন্য পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংকে ঢাকায় পাঠায়। সুজাতা সিং ঢাকায় এসে অত্যন্ত নগ্নভাবে বাংলাদেশের নির্বাচনে তথা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। জেনারেল এরশাদ এবং জাতীয় পার্টি ঐ নির্বাচন বয়কট করার পক্ষে ছিল।
কিন্তু সুজাতা সিং এরশাদের অনড় অবস্থান বুঝতে পেরে এরশাদকে বাদ দিয়ে সুকৌশলে রওশন এরশাদ সহ একটি অংশকে ম্যানেজ করে জাতীয় পার্টিকে ঐ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করেন। এই নির্বাচনে জিএম কাদের সহ দলের বৃহৎ একটি অংশ এরশাদের নির্দেশে নিজেদের মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহার করে নেয়।
এরশাদ নিজেও মনোনয়ন প্রত্যাহারের জন্য রিটার্নিং অফিসারদের কাছে চিঠি পাঠান। কয়েকটি আসনের প্রার্থীতা প্রত্যাহার করার চিঠি গ্রহণ করা হলেও রংপুরের একটি আসনে প্রার্থীতা প্রত্যাহারের চিঠি যথাযথ হয়নি বলে আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়।
ফলে হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এরশাদ। নির্বাচিত হয়ে হাসপাতাল থেকে সোজা সংসদে গিয়ে স্পিকারের কাছে শপথ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে গাড়িতে ফ্ল্যাগ উড়িয়ে বাসায় ফিরে আসেন তিনি।
প্রার্থী বিহীন নির্বাচনে অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টি সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসন নিলে এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হন।
হাসপাতালে থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ‘সময় হলে’ সব কথা বলবেন বলে ছিলেন এরশাদ।

জাতিসংঘ সহ বিশ্ব মতামতকে উপেক্ষা করে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার দোহাই দিয়ে সুবিধা মত খুব অল্প সময়ের মধ্যে সবদলের অংশ গ্রহণে আরেকটি নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে, সববিরোধী দলগুলোর বর্জনের মুখে ভোটারশূন্য, প্রার্থী বিহীন, নজিরবিহীন সহিংসতা ও ভোট কারচুপি মধ্যে দিয়ে দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
নির্বাচনের আগের দিন ভোট বর্জনকারীরা রাতে আগুন দিয়ে পুড়ে দেয় দেশের শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নির্বাচনী সহিংসতায় সারাদেশে ১৮ জনের বেশী মানুষ নিহত হয় এবং কয়েক হাজার মানুষ আহত হয়।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় আওয়ামী লীগের ১৫৩জন প্রার্থী বিনাপ্রতিদ্বন্ধীতায় নির্বাচিত হয়। বাকি ১৪৭টি নিজেরা এবং মহাজোটের প্রার্থীদের মধ্যে ভাগ বন্টন করে দেওয়া হয়। নিজেদের ডামি প্রার্থী দাঁড় করিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
যে কোনো নির্বাচনে বা খেলায় কে হেরেছে, কে জিতেছে তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবে সবারই কৌতূহল থাকে। কিন্তু দশম সংসদ নির্বাচনের পর এ নিয়ে কারও কোনও মাথাব্যথা কৌতূহল দেখা যায়নি।
বিরোধী দল ও জনগণের বর্জনের মধ্য দিয়ে যে নির্বাচনী নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে, তাতে অতীতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের সব রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টিকে নিয়ে যে নগ্ন নাটকের অবতারণা করা হয়েছিল তা গণতন্ত্রের জন্য এক কলঙ্কজনক ঘটনা। এরশাদ নির্বাচন বর্জন করার ঘোষণা দেওয়ার পর রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে তাকে এবং তার দলকে কীভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানো হয়েছে তাও নজিরবিহীন ঘটনা।

এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত, রওশন এরশাদ সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা, আর জাতীয় পার্টি থেকে কয়েক জনকে মন্ত্রীর পদ প্রদান করে একটি অদ্ভুত চরিত্রের সংসদ ও সরকার প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগ।

দেশি বিদেশি অনেকে দাবি করেন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সরকারের নানান ব্যর্থতা দুর্নীতি সন্ত্রাস গুম খুনের কারণে ভিতরে ভিতরে বিএনপির পক্ষে একটি গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। নির্বাচনে অংশ গ্রহণের জন্য দেশি-বিদেশি বন্ধুদের পরামর্শ উপেক্ষা করে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। এটি ছিল বিএনপি রাজনীতির একটি মারাত্মক ভুল।
অনেকেই দাবি করেন এ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের জয়লাভের সমূহ সম্ভাবনা ছিল।আবার কারো কারো মতে অধিকাংশ আসনে জয়লাভ না করলেও বিএনপি অন্তত ১০০ থেকে ১২০টি আসনে জয়লাভ করত এবং ৯৬ সালের মত একটি শক্তিশালী বিরোধী দলে পরিণত হতো।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি ৫ জানুয়ারির পর ‘অবৈধ সরকার’ উচ্ছেদের দাবিতে নতুন করে আন্দোলনের মাঠে নামে বিএনপি।
রাজনৈতিক কর্মসূচির আড়ালে সহিংসতার দীর্ঘতম এক রেকর্ড সৃষ্টি করে বিএনপি – জামায়াত জোট।
যাতে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের । বিএনপি-জামায়াতের দুই মাসের টানা হরতাল অবরোধে নিহত হয়েছিল ১১৫ জন নিরীহ মানুষ, যার ৯০ জনই ছিল সাধারণ মানুষ।
এদের মধ্যে শুধু পেট্রোল বোমায় দগ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিল ৬২ জন এবং সরকারের পুলিশ র‌্যাবের সাথে কথিত ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছিল ৩৬ জন মানুষ। সহিংস রাজনীতির কাছে জিম্মি সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটানা এত সময় ধরে হরতাল – অবরোধের ইতিহাস আর নাই।
পাকিস্তান আমল থেকে অতীতের যে কোন আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় এ রকম নাশকতা বা সাধারণ মানুষকে নিশানা করে আগে কখনো এত নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটেনি।

২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন বর্জনের পর নির্বাচন প্রতিহত বা প্রার্থীবিহীন তামাশর নির্বাচনে নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। বিপুল জনসমর্থন থাকার পরেও দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্বের দুর্বলতা, নেতৃত্বের কোন্দল, একের প্রতি অন্যের অবিশ্বাস এবং ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে সন্ত্রাসের জের বিএনপিকে গত ৬ বছর ধরেই টানতে হচ্ছে। রাজনৈতিক সহিংসতা ও আগুন সন্ত্রাসের ঘটনায় ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার মামলা হয়েছে৷ মামলা, হামলা আর পুলিশের ধরপাকড় হয়রানির কবলে বিএনপি নেতা-কর্মীদের ভয়ার্ত করে তুলেছে। সভা সমাবেশ মিছিল মিটিং দূরের কথা পুলিশের হামলায় বিএনপির নেতা কর্মীরা রাস্তায় দাঁড়াতে পারেনি তেমনি ঘরে থাকতেও পারছে না। ইদানিং নতুন করে সংযোজিত হয়েছে ‘গায়বী’ মামলা।

দলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন কারাগারে অসুস্থ অবস্থায় বন্দি আছেন৷ জিয়া অর্ফানেজ ট্রাস্ট মামলায় তাঁর পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়৷ দণ্ড মওকুফের জন্য উচ্চ আদালতে আপিল করতে গিয়ে দণ্ড মওকুফ দূরের কথা পাঁচ বছরের সজা বৃদ্ধি করে দশ বছরের সাজা দিয়েছে আপিল বিভাগ। অন্য আরেকটা মামলায় সাত বছরের দণ্ড হয়েছে। সতের বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে তিনি কারাগারে চিকিৎসাধীন আছেন।
দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে লন্ডনে পালিয়ে আছেন। সেখান থেকে আদেশ নির্দেশ দিয়ে দল পরিচালনা করেছেন।

দুর্নীতির মামলায় কারাভোগরত খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে রাজপথে কোন জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি বিএনপি। এমনকি মুক্তির দাবিতে কার্যকর কোন কর্মসূচি দিতেও ব্যর্থ হয়েছে বিএনপি।

বিএনপির রাজনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ আওয়ামী লীগ
আওয়ামী লীগ ধীরে ধীরে নিজেদেরকে গুছিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে ।
২০১৪ এর ৫ই জানুয়ারির নির্বাচিত সরকারের গ্রহণযোগ্যতা এবং স্থায়ীত্ব নিয়ে প্রথমদিকে আওয়ামী লীগে নিজেদের মধ্যেই সংশয় ছিল। শেখ হাসিনার কারিশমাটিক নেতৃত্বের গুণে আওয়ামী লীগ বহিঃবিশ্বে নিজেদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়।
বিশেষ করে জঙ্গিবাদ-ইসলামি মৌলবাদ – ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে তাদের জোরালো অবস্থান পশ্চিমা বিশ্বে খুব প্রশংসিত হয়। তাছাড়া ৯৬-২০০১ সালের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে জোর দেওয়া হয়।
অতীতে দেশের স্বার্থে ভারতের কাছ গ্যাস বিক্রি করতে রাজি না হওয়ায় ভারত বিএনপির সাথে গোপন চুক্তি করে ২০০১ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সুকৌশলে পরাজিত করে বলে আওয়ামী লীগ তখন নিজেরা দাবি করেছিল। এই দাবির পক্ষে তখন জাতির সামনে কিছু তথ্য প্রমাণও উপস্থাপন করেছিল আওয়ামী লীগ।
ভারতের সাথে কয়েকটি অমীমাংসিত ইস্যুর সমাধান, ভারতকে বিনাশুল্কে ট্রানজিট সুবিধা, চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুযোগ প্রদান সহ বেশ কিছু ছাড় দিয়ে বিজেপি শাসিত সরকারকে নিজেদের পক্ষে রাখতে সক্ষম হয় তারা।
ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে আরেকটা নির্বাচনের অঙ্গীকার থেকে সরে গিয়ে জাতীয় পার্টিকে বশে রেখে আওয়ামী লীগ নির্বিঘ্নে মেয়াদের পাঁচ বছর ক্ষমতা নিজেদের দখলে রাখতে সক্ষম হয়।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিজেদের দাবি দাওয়া থেকে সরে এসে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে অতীতের মত ভুল না করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে সম্মত হয়।
এই নির্বাচনকে সামনে রেখে আবারো শুরু হয় জাতীয় পার্টিকে নিয়ে আগের মত খেল তামাশা।
এরশাদকে চাপে রেখে একেবার একেক কথা বলতে বাধ্য করার পুরনো রাজনীতি।
এরশাদ সকালে মহাজোট থেকে বের হয়ে যাওয়ার পক্ষে বলছেনতো বিকেলে মহাজোটে থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা বলছেন।
মূলত বিএনপিকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবে এরশাদকে দিয়ে একেকবার একেক কথা বলানো হচ্ছিল। অর্থাৎ বিএনপি নির্বাচনে না আসলে ২০১৪ সালের মত আরেকটি নির্বাচন করে নিতে সরকার বদ্ধপরিকর।
এরশাদ শেষ বয়সে কারাগারে যাওয়ার ভয়ে ক্ষমতাসীনদের হাতের পুতুলের মত ব্যবহৃত হতে লাগলেন। এরমধ্যে ২০১৪ সালের মত নাটকীয় অসুস্থতায় এরশাদ আবারো হাসপাতালে ভর্তি হন। দলের প্রার্থীদের বাচাই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে না দিয়ে এরশাদকে হাসপাতালে আটকিয়ে রাখা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। একদিন হাসপাতাল থেকে পালিয়ে এসে বনানী অফিসে দলের নেতা কর্মীদের উদ্দেশ্যে এরশাদ এমন দাবি করেছিলেন।
সবাই যখন নির্বাচনের ঢামাঢোল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন এরশাদের হঠাৎ করে অসুখ বাড়তে থাকে।
দ্রুত তাকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা নিয়ে দেশে এলেও নির্বাচনী কাজে আর অংশগ্রহণ করতে পারেননি। অসুস্থ অবস্থায় আবারো হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে জীবনের শেষ নির্বাচনে জয়ী হন তিনি।

সবদলের অংশ গ্রহণে দলীয় সরকারের অধিনে নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে। একটি সুষ্ঠু সুন্দর নির্বাচনে আশায় যখন সমগ্র জাতি আশা করছিল। জাতির সব আশা আকাঙ্ক্ষাকে ধুলোয় মিশিয়ে, প্রশাসনের সহযোগিতায় দলীয় নেতাকর্মীদের দিয়ে ভোটের পূর্বরাতে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ ভোট কেটে বাক্সে ভরে রাখা হলো। পরের দিন ভোটারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে কেন্দ্রে গেলে তাদেরকে তাড়িয়ে দিয়ে প্রহসনের আরেকটি নির্বাচন জাতি প্রত্যক্ষ করলো।
নিশিরাতের ভোটে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যজোটের শোচনীয় পরাজয় হলেও সরকারের সাথে সখ্যতা রেখে কোথাও জোটবদ্ধ নির্বাচন আবার কোথাও জোটের বাহিরে অর্থাৎ নিজেরা নিজেদের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা করে মহাজটের এক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
নিশিরাতের ডিজিটাল ভোটে জাতীয় পার্টির এরশাদ সহ ২২ জন সদস্য সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যজোটের ৮ জন প্রার্থী জয়ী হন। জাতীয় পার্টি আবারো সংসদে বিরোধী দলের মর্যাদা লাভ করে।
এরশাদ ভোটার বিহীন নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে হুইল চেয়ার করে সংসদে গিয়ে শপথ গ্রহণ করেন। জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলের নেতা নির্বাচিত হন।

এরশাদের ভাষায়, ৯০ বছরের জীবনের শেষে ২৯টি বছরে একটি দিনও তিনি সুখী ছিলেন না।
আর তার ওই অসুখের কারণ ছিল রাজনৈতিক বিবেচনায় দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগে দায়ের করা সাড়ে তিন ডজনের অধিক মামলা।
বিএনপি সরকারের আমলে হত্যা, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে এরশাদের বিরুদ্ধে ৪৩টি মামলা দায়ের করা হয়।
তন্মধ্যে ৪২টি মামলায় তিনি উচ্চ আদালত থেকে মুক্তি পেলেও রাজনৈতিক হিসাব নিকাশের জটিল অংকের কারণে, জোট আর ভোটের রাজনীতিতে এরশাদকে বশে রাখতে রায় ঘোষণার পূর্ব মূহুর্তে ২৩ বার বিচারক পরিবর্তন করে মেজর মঞ্জুর হত্যা মামলার রায় প্রদানকে দীর্ঘায়িত করা হয়।
পরিতাপের বিষয় মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত মেজর মঞ্জুর হত্যা মামলার দায় মাথায় নিয়েই তাকে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হয়।

ক্ষমতাসীন সরকার এবং দলের সুবিধাবাদী ক্ষমতালীপ্সু একটি মহলের যোগ সাজশে। মেজর মঞ্জুর হত্যা মামলায় তাকে সর্বোচ্চ শাস্তির ভয় দেখিয়ে শেষ বয়সে দুর্বিষহ জেল জীবনের কথা চিন্তা করে বা ফাঁসির ভয়ে বারবার রাজনৈতিক অবস্থা পরিবর্তন করে মানুষের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেন এবং রাজনীতিতে বারবার সিদ্ধান্ত বদলের ফলে অনেকেই তাকে ‘রাজনীতিতে আনপ্রেডিক্টেবল এরশাদ’ বলে সম্বোধন করতো।
মৃত্যুর আগে তার স্বপ্ন ছিল যে কোন মূল্যে আরেকবার জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় নিয়ে যাওয়ার । আবারো রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রবল ইচ্ছা ছিল। অনেকেই বলেন ৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনে সমর্থন দিলে এরশাদকে প্রেসিডেন্ট করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
শেষ জীবনে প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ছিল তার রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য। দেশবাসীর জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে যাওয়ার কথাও তিনি সবসময় বলতেন । কিন্তু তার সেই শেষ ইচ্ছা এবং স্বপ্নগুলো আর পূরণ হয়নি। একাদশ সংসদে বিরোধীদলের নেতা হিসেবেই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান একসময়ের মহাপরাক্রমশালী হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বার্ধক্যজনিত নানান রোগে আক্রান্ত হয়ে সিএমএইচে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৪ই জুলাই ২০১৯ মৃত্যু বরণ করেন।

দোয়া করি যেখানেই থাকুন শান্তিতে থাকুন, আল্লাহ আপনাকে বেহেশত দান করুন ।

বেলায়েত হোসেন কাজল ।