পৃথিবীতে যুগে যুগে অসংখ্য মহামারীর ঘটনা ঘটেছে, মৃত্যু হয়েছে কোটি কোটি মানুষের। এসব মহামারীর মধ্যে প্লেগ আর ফ্লুর নামই সবচেয়ে বেশি শোনা যায়।
অনেক সময় দেখা যায়, নানা কারণে একটি ছোট অঞ্চলে প্রাদুর্ভাব ঘটা রোগ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। তখন এ মহামারী রূপ নেয় বিশ্বমারীতে।
ইতিহাসে অর্ধশতাধিক মহামারীর লিখিত তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়। মহামারীগুলোতে মানব জাতি বিভিন্ন সময়ে বড় সংকটে পড়েছিল।
যুগ-যুগান্তরের বিশ্বসভ্যতার কিছু গুরুত্বপূর্ণ মহামারীর ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় :—
** * ৪৩০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের : দ্য প্লেগ অব এথেন্স’ নামে পরিচিত পৃথিবীর প্রথম প্লেগ মহামারীর আগমন ঘটে ।
স্পার্টানদের সাথে গ্রিকদের যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এ মহামারীতে কয়েক দিনের ব্যবধানে হাজার হাজার গ্রিক সৈন্য ছাড়াও প্রায় ৩০,০০০ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়।
*** ৫৪১ খ্রিষ্টাব্দের দ্যা প্লেগ অব জাস্টিনিয়ান : বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অন্যতম শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী সম্রাট জাস্টিনিয়ান রোমান সাম্রাজ্যের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য যেসব অভিযান চালিয়ে ছিলেন, সেগুলোর জন্য ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন । কিন্তু সেসব অভিযান ছাপিয়ে তার নাম অধিকবার উচ্চারিত হয় তার শাসনামলে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ মহামারীর কারণে।
৫৪০-৫৪১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে মিশরে এক ভয়ানক প্লেগের উৎপত্তি ঘটে। ইঁদুরের মাধ্যমে বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে এই রোগ । তৎকালীন পৃথিবীতে মিশরই ছিল সমগ্র ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের খাদ্যশস্যের সরবরাহের একমাত্র দেশ । ফলে এখানে সৃষ্ট রোগ সহজেই পূর্ব থেকে পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ে ।
রোগের প্রথম আক্রমণটা ছিল বাইজান্টাইনের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে (বর্তমান ইস্তাম্বুল)। কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, মহামারীর চূড়ান্ত পর্যায়ে সেখানে প্রতিদিন গড়ে ৫ হাজার মানুষ মারা যেত !
প্রায় ৫০ বছর টিকে থাকা এ মহামারীতে আড়াই কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। তবে কিছু কিছু উৎসে থেকে দাবি করা হয় সংখ্যাটা ১০ কোটিতেও হতে পারে ।
*** ১৩৩৪ খিষ্টাব্দের দ্যা গ্রেট প্লেগ অব লন্ডন : দ্যা গ্রেট প্লেগ অব লন্ডন নামে পরিচিত হলেও ১৩৩৪ সালের প্লেগ আসলে ছড়ায় চীন থেকে। এরপর ইতালির ফ্লোরেন্স শহরেই ছয় মাসে প্লেগে মারা যায় ৯০ হাজারের অধিক মানুষ। পুরো ইউরোপ জুড়ে মারা যায় আড়াই কোটির উপরে মানুষ।
*** ১৩৪৬ খ্রিষ্টাব্দে দ্যা ব্ল্যাক ডেথ: পৃথিবীর ইতিহাসে কিংবা একটু ছোট পরিসরে বললে ইউরোপের ইতিহাসে ব্ল্যাক ডেথের মতো আলোচিত মহামারী আর নেই।
এরকম ভয়ানক, সর্বগ্রাসী রোগের প্রাদুর্ভাব সম্ভবত পৃথিবী একবারই দেখেছিল। কৃষ্ণ সাগরের (ব্ল্যাক সি) উপকূলবর্তী অঞ্চল গুলো থেকে এ রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল বিধায় একে ব্ল্যাক ডেথ বলা হয়।
১৩৪৭-৫১ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালই ছিল ব্ল্যাক ডেথের সবচেয়ে বিধ্বংসী সময়। এ সময় ইউরোপের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের প্রাণবায়ু কেড়ে নেয় এ মহামারী। তবে কারো কারো মতে এ অভিশপ্ত মহামারীর প্রভাব টিকে ছিল অন্তত ২০০ বছর। ইতিহাসবিদদের মতে, এ ২০০ বছরে অন্তত ১০ কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন!
***১৫১৯ খ্রিষ্টাব্দের স্মলপক্স এপিডেমিক অব মেক্সিকো : বর্তমান মেক্সিকোতে ১৫১৯ সালে স্মলপক্স ছড়িয়ে পড়লে দুই বছরে মারা যায় প্রায় ৮০ লাখ মানুষ।
*** ১৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দের স্মলপক্স এপিডেমিক অব আমেরিক : ফ্রান্স, গ্রেট বৃটেন ও নেদারল্যান্ডসবাসীর মাধ্যমে ১৬৩৩ সালে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসে স্মলপক্স ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রায় ২ কোটি মানুষ মারা যায় বলে দাবি করেন ইতিহাসবিদরা।
*** ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ইয়েলো ফিভার এপিডেমিক অব আমেরিকা: আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ায় ১৭৯৩ সালে ইয়েলো ফিভার মহামারী আকার ধারণ করে। এতে নগরের ১০ ভাগের এক ভাগ, প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ মারা যায়।
*** ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দের দ্যা থার্ড প্লেগ প্যানডেমিক: ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্তৃত আকারে প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটে মোটামুটি ৩ বার। তৃতীয়টির উৎপত্তি ১৯ শতকে চীনে, চীন যখন বিশ্ববাণিজ্যে ভালোরকম প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে । ইউয়ান নামক একটি ছোট্ট গ্রামে প্রথম এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ক্রমে তা বিস্তার লাভ করতে করতে হংকং আর গুয়াংঝু প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে, যে শহরগুলোর সাথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরাসরি বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল। ফলে প্লেগ ছড়িয়ে যায় ভারত, আফ্রিকা, ইকুয়েডর, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও। প্রায় দুই দশক স্থায়ী এ মহামারীতে প্রাণ হারায় ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ। পূর্বের অনেক মরণঘাতি রোগই তখন প্রতিনিয়ত ডাক্তারদের নিরাময় করার সক্ষমতার মধ্যে চলে আসতে শুরু করে। আর এ কারণেই মূলত চতুর্থবার বিস্তীর্ণভাবে প্লেগ মহামারী ঘটেনি।
*** ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দের দ্যা প্লেগ এপিডেমিক অব ফার্স্ট ডিকেড : বিশ শতকের সবচেয়ে বড় প্লেগ মহামারী আকারে দেখা দেয় ১৯১০ সালে। চীনের মাঞ্চুরিয়ায় দুই বছরে মারা যায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষ। এটি চতুর্থবার প্লেগের মহামারী হলেও তা বিস্তীর্ণভাবে ছড়ায়নি।
*** ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দের দ্যা পোলিও এপিডেমিক অব আমেরিকা : ১৯১৬ সালে পোলিও রোগ প্রথম মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। সেবছর নিউইয়র্কে ৯ হাজার মানুষ পোলিওতে আক্রান্ত হয়, যার মধ্যে ৬ হাজার মানুষই মৃত্যুবরণ করে! চিকিৎসা বিজ্ঞান তখন যথেষ্ট উন্নত হলেও চিন্তার বিষয় ছিল যে, এ মহামারীতে মৃত্যুর হার আগের যে কোনো মহামারীর চেয়ে বেশি ছিল! নিউইয়র্ক শহর থেকে ক্রমে পোলিওর প্রাদুর্ভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবছর বিশ্বে কত শত মানুষ পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, তার কোনো সঠিক তথ্যও পাওয়া যায় না। অবশেষে ১৯৫০ সালে জোনাস সাল্ক পোলিও টিকা আবিষ্কার করলে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ কমে যায়।
*** ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের দ্যা ইনফ্লুয়েঞ্জা প্যানডেমিক বা দ্যা গ্রেট ফ্লু : নানা কারণে আলোচিত বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল আক্ষরিক অর্থে হত্যা আর প্রাণহানীতে পরিপূর্ণ। ১৯১৮ সালের নভেম্বরে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেছে, রক্তস্রোত দেখতে দেখতে ক্লান্ত বিশ্ববাসী যখন পরিত্রাণের আশায় মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে, তখন নীরবে শুরু হয়ে গিয়েছিল আরেক মৃত্যুর মিছিল। এ মিছিলটি ‘দ্যা ইনফ্লুয়েঞ্জা প্যানডেমিক’ নামে পরিচিত। বিশ্বযুদ্ধের শেষ প্রান্তেই এর সূচনা হলেও মহামারী আকারে বিস্তার ঘটে ১৯১৯ সালে। অল্প সময়ের মধ্যেই সমগ্র বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ আক্রান্ত হয়ে পড়ে ইনফ্লুয়েঞ্জায়, মৃত্যুর মিছিল বাড়তেই থাকে। ৪ বছরের অধিক কাল বিস্তৃত রক্তক্ষয়ী প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যেখানে ২ কোটির মতো মানুষ প্রাণ হারায়, সেখানে মাত্র এক বছরেই ইনফ্লুয়েঞ্জা প্যানডেমিক কেড়ে নেয় ১ কোটির বেশি মানুষের প্রাণ!
*** ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের স্মলপক্স এপিডেমিক অব ইন্ডিয়া:
গুটি বসন্তের টিকা আবিষ্কার হয়েছিল ১৮ শতকের শেষভাগে ১৭৯৬ সালে। এডওয়ার্ড জেনার এ টিকা আবিষ্কার করেন। এটিই ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথম সফল টিকা। অথচ টিকা আবিষ্কারের প্রায় ২০০ বছর পরও এ রোগে আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে!
১৯৭০ সালে ভারতে হঠাৎ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে গুটি বসন্ত। রাতারাতি এ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে এক লক্ষাধিক লোক । এক বছরেই মৃত্যুবরণ করে ২০ হাজারের বেশি মানুষ। যদিও এ তালিকার অন্যান্য মহামারীর তুলনায় এ মৃত্যুর সংখ্যাটা বেশ কম, তথাপি চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক সময়ে, যখন বিশ্ব প্রায় গুটি বসন্ত মুক্ত হয়ে গেছে, তখন ভারতের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে এরূপ মহামারী ছিল বেশ হতাশাজনক।
*** ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে এইচআইভি ভাইরাস : প্রথম এইচআইভি ভাইরাস শনাক্ত হয় ১৯৮৪ সালে। এ ভাইরাসের কারণে এইডস রোগে সে বছরই আমেরিকায় মারা যায় ৫,৫০০ জন। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৩৫ মিলিয়ন মানুষ এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত। আর এ পর্যন্ত এইডসে মারা গেছে আড়াই কোটির বেশি মানুষ।
***২০০৩ খ্রিষ্টাব্দের ‘সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম’ সার্স ভাইরাস : সার্স নামটি মহামারীর তালিকায় নতুন এবং আমাদের কাছে খুব পরিচিত।
হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বায়ুবাহিত এ রোগের জীবাণু সহজেই ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম বলে জনমনে সংক্রমণের আশঙ্কাটা সবচেয়ে বেশি। সমগ্র উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ এবং এশিয়ার কয়েকটি দেশে কয়েক লক্ষাধিক মানুষ সার্স ভাইরাসে আক্রান্ত হয়।
তবে চিকিৎসা বিজ্ঞান দ্রুত কাজ শুরু করলে মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারেনি। মাত্র ৬ মাসের মধ্যেই বিশ্বব্যাপী সার্স নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এসময় এ রোগে মৃত্যু হয় ৭৩৭ জনের।
*** ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের সোয়াইন ফ্লু এপিডেমিক : বিশ্বজুড়ে ২০০৯ সালে সোয়াইন ফ্লু বা এইচ ওয়ান এন ওয়ান ফ্লুতে ১৮,৫০০ জন মারা গেছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। তবে এ রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ৫ লাখ ৭৫ হাজার বলেও ধারণা করা হয়।
*** ২০১০ খ্রিষ্টাব্দের কলেরা এপিডেমিক অব হাইতি : হাইতিতে ২০১০ সালে ভয়ঙ্কর এক ভূমিকম্পের পর কলেরা মহামারী রূপ নিলে ১০ হাজার মানুষ মারা যায়।
*** ২০১২ খ্রিষ্টাব্দের হাম : ২০১২ সালে বিশ্বজুড়ে ভাইরাস জনিত রোগ হামে মারা যায় ১ লাখ ২২ হাজার মানুষ। সে বছর পুরো বিশ্বে ব্যাকটেরিয়া সংক্রামক রোগ টিউবার কিউলোসিসে মারা যায় ১.৩ মিলিয়ন মানুষ। এছাড়া প্রতিবছর টাইফয়েড জ্বরে মারা যাচ্ছে ২ লাখ ১৬ হাজার মানুষ।
*** ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের করোনা বা কোভিড-১৯ প্যানডেমিক : কেভিড – ১৯ বা করোনা ভাইরাসে এখনো পর্যন্ত চলমান এ প্যানডেমিকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭ হাজারের বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ১৮২৫০০ জন মানুষ। বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর ১৫০ টির কাছাকাছি দেশে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস ঘটিত এ রোগের উৎপত্তি ছিল চীন এবং ইউরোপের এপিসেন্টার ইতালি। এতে প্রতিনিয়ত মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যাও। ইতিমধ্যে করোনা ভাইরাসকে বৈশ্বিক মহামারী ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
