প্রবাসীদের জীবন কেমন কাটে ? এ প্রশ্নটা অনেকেরই। কারও কারও রয়েছে বিশেষ কৌতূহল। অন্তত যারা প্রবাসী নন। কৌতূহলটা তাদেরই বেশি যাদের স্বজনেরা প্রবাসী। আমজনতার আগ্রহ যে নেই, তা নয়। তা ক্ষেত্রবিশেষে। তাদেরও কৌতূহল হয়, যখন কোনো প্রবাসী হয়ে ওঠে সেলিব্রেটি।
আমরা বাঙালি প্রবাসীরা কেমন আছি ? ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বললে কিভাবে কাটছে আমাদের জীবন? দেশের অস্থিতিশীল গুমোট রাজনৈতিক পরিবেশের বাইরে থেকে আমরা কি খুব ভালো আছি ? দেশ ও স্বজনদের দূরে রেখে আমাদের প্রবাসজীবন কী খুব স্বস্তিতে কাটছে ? নাকি সোনার হরিণের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে আমরাও ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। এই প্রশ্নগুলো করার পেছনে অন্য কোনো অযাচিত উদ্দেশ্য নেই। সুখ-দুঃখ আর কষ্টের অনুভূতিগুলো বলার প্রয়াসমাত্র। কারণ, কারও কাছে যাপিত জীবন বড্ড বেশি অহংকারী। কারও কাছে বেঁচে থাকাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। হোক না সে প্রবাসী কিংবা অন্য কেউ ? দশ বছরের প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি থেকেই আজকের এই লেখা।
প্রবাস মানেই কি নিঃসঙ্গতা ? একাকিত্ব ? নাকি প্রবাস মানেই হাড়ভাঙা পরিশ্রম ? কেমন কাটে প্রবাসজীবন ? কেউ বলে মলিন নয়তো ফ্যাকাশে। কেউ বলে পানসে। কারও কাছে রোমাঞ্চকর, অতিমাত্রায় স্বাধীনতা। কারও কাছে জীবনের সোনালি অধ্যায়ের যাত্রা শুরু। কেউ ভাবছে, এই তো চলছি সোনার হরিণের পেছনে। আবার কেউ ফেলে দীর্ঘনিঃশ্বাস। যেন কোনো এক নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত। এই ভিন্ন ভিন্ন ভাবনাগুলো তাদের, যারা প্রবাসী। তবে পুরো বিষয়টাই নির্ভর করছে ব্যক্তিবিশেষের ওপর। ব্যক্তিজীবনের দৃষ্টিভঙ্গি ও তার মানসিকতার ওপর। যাপিত জীবনের স্টাইল, কাজকর্মের শ্রেণিভেদ, পারিবারিক ঐতিহ্য ও রুচিবোধের ওপর।
আর যারা প্রবাসী নন, তাঁদের ধারণাটা কেমন প্রবাসীদের সম্পর্কে ? এটা আমার পক্ষে বলা মুশকিল হলেও কিছুটা তো উপলব্ধি করতে পারি। তাই বলছি। যত দূর উপলব্ধি করেছি, প্রবাসী সম্পর্কে অপ্রবাসীদের ধারণা পুরোটাই অর্থকেন্দ্রিক। অর্থাৎ, প্রবাসী মানে অঢেল অর্থ উপার্জনের কারিগর। স্বজনেরা অন্তত ওই একটি বিষয়ে পরোপুরি সজাগ। প্রবাসী মানে, থাকবে অর্থিক সচ্ছলতা। এই ধারণাটা মোটেই ভুল নয়। কিংবা নতুন কিছু নয়। এটা তো ঠিক বাংলাদেশের সমৃদ্ধ অর্থনীতির চাকা ঘোরানোর চাবিকাঠি তো দীর্ঘকাল ধরেই প্রবাসীদের নিয়ন্ত্রণে। বাংলাদেশ ব্যাংক বছর ঘুরে গুনছে হাজার কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ! তাই বুঝতে কারও কষ্ট হয় না, প্রবাসী মানে হাড়ভাঙা পরিশ্রমী একদল খেটে খাওয়া মানুষ।
প্রবাসীদের রকমফের আছে। এই রকমফের অবশ্য অঞ্চলভিত্তিক। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবাসীদের যাত্রা ভিন্ন ভিন্ন কারণে। এদের অধিকাংশ আসছে অর্থ উপার্জনের জন্য। এদের কেউ দক্ষ,অবার কেউ অদক্ষ। আবার কেউ আসছে উচ্চশিক্ষার্থে। এদের কেউ দীর্ঘমেয়াদি, আবার কেউ স্বল্প সময়ের জন্য। উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন এদের সবাই প্রবাসী। সবাই চলছে ওই সোনার হরিণের পেছনেই ৷ স্বজনদের নিয়ে যদি কিছুটা ভালো থাকা যায়। ঘাম, রক্ত, এমনকি জীবন দিয়েও পরিবার ও দেশের ভাগ্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছেন তারা ৷ ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বাংলাদেশিদের বৈধ অবৈধ পথে বিদেশ পাড়ি জমানোর প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে৷ ,এর পাশাপাশি প্রবাসে নির্যাতনও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে ৷ প্রায় নিয়মিতই আসছে মৃত্যুর খবর ৷ পরিবারে সুদিন ফেরানোর আশায় বিদেশে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরছেন অনেকেই ৷ এইসব মৃত্যুকেই খুব স্বাভাবিক বলা যায় না ৷ অধিকাংশেরই মৃত্যুর কারণ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, হৃদরোগ, কর্মক্ষেত্র বা সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা ক্যানসারের মতো জটিল কোনো রোগে ৷ প্রবাসে নিঃসঙ্গতা, একাকিত্ব ,হাঁড়ভাঙ্গা পরিশ্রম , নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, খারাপ পরিবেশে কাজ করা ইত্যাদি কারণে হৃদরোগ বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা জটিল কোন রোগে আক্রান্ত হয়ে বয়স হওয়ার আগেই অনেকের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে যাচ্ছে । একজন প্রবাসীর মনের অবস্থা, তার একাকিত্ত্ব, তার আবেগ, তার কষ্ট, তার উদাসীনতা, তার নীরব কান্না কেউ বুঝতে পারে না। এটা সত্য যে এই অনুভূতি গুলো অনুভব করাও কারো পক্ষে সম্ভব না।প্রবাস জীবনে কেউ দুঃখ পায় না, কারন দুঃখ পেতে আপনজন প্রয়োজন হয়। আপনজন ব্যতীত অন্য কেউ দুঃখ দিতে পারে না। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে অনেককে হারিয়েছি। জানিনা আবার কাকে হারাব ? একটা আশঙ্কা মনের গভীরে সব সময় তোলপাড় করে।প্রবাস জীবন সত্যিই বড় কঠিন, বড়ই নির্মম। জীবনের নিয়মে জীবন চলে, একে থামিয়ে দেয়ার শক্তিতো কারো হাতেই নেই। শত ব্যস্ততার মাঝেও নিজেকে খুজে নিতে হয় বেঁচে থাকার নতুন কৌশল, বের করতে হয় একাকী থাকার তীব্র ভারী পাথরটাকে বুক থেকে আস্তে আস্তে টেনে নামানোর করুণ প্রচেষ্টা।সময়ের ব্যবধানে জীবনের দায়বদ্ধতার খাতিরে আপনজন থেকে দূরে থাকলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে নেই দেশের উজ্জল, ভাস্বর অসংখ্য সব স্মৃতি।একাকী নির্জন রাতের আকাশে হাজার তারার ভিড়ে আজও হারিয়া যাওয়া বন্ধুদের শূন্যতা অনুভব করি। প্রকৃত বন্ধুদের শূন্যতা প্রতি মূহুর্তে আহত করে আমার প্রবাসী মন। আমার এলোমেলো ভাবনাগুলো ক্লান্ত হয়ে মিশে যেতে চায় হারানো অতীতে।সময়ের পরিবর্তনে মনও বদলে যায়, বদলে যায় ধ্যান-ধারণা। জাগতিক পৃথিবীর রূঢ় বাস্তবতা বুঝে যাওয়ার পর এখন আর নতুন করে বন্ধু খুজি না।তারপরও বন্ধুত্বের জন্যে মনটি হাহাকার করে। প্রত্যক মানুষই তার আপন পরিবার, পরিজন, বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে সুখের কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে থাকতে চায়। এ চাওয়া কি অন্যায় ? প্রত্যেকেই সুখের জীবন গড়তে অজস্র ধন-সম্পদের অধিকারী হতে চায়। কিন্তু সবাই কি সফল হয় ? সফল হতে না পারলে তখন জীবন হয়ে উঠে দুর্বিষহ ও যন্ত্রণাময়।প্রবাসী হয়ে সম্পদের পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু ভালবাসা, স্নেহ, মমতা হ্রাস পেয়েছে এটা সকল প্রবাসীই স্বীকার করবে।প্রবাসের ব্যস্ত সময় বয়ে যাচ্ছে সময়ের নিয়মে শ্যামল সবুজ বাংলার বহতা নদীর মত। সময়ের সাথে জীবনের অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে, শুধু যার গেছে সেই জানে কিভাবে গেছে। ২৮শে এপ্রিল ২০০৭ সাল থেকে ২০২০ কি ভাবে চলে গেল জীবনের তেরটি বছর ? জানিনা আরো কতো দিন, কতো মাস বা বছর চলে যাবে ।আমার পরিবার, আমার বন্ধুদেরকে বলবো , রাত যায় দিন যায় মাস যায় বছর যায় থাকি পরে একা, রোজা যায় ঈদ যায় যায় কতো সুখের দিন। তোমরা করো কতো আনন্দ আমরা দেখি প্রতিদিন তবুও আমরা অনেক সুখ পাই যখন শুনতে পাই তোমরা আছ সুখে । আমরা ভালো আছি প্রবাসে জীবনের সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে ভুলে। বিদেশে আমাদের একমাত্র পরিচয় আমরা বাঙালি।