পেঁয়াজের মত ভালবাসা নিয়ে বাংলা সাহিত্য ভান্ডারে কোন গল্প আছে কিনা আমার ঠিক জানা নাই। কিন্তু লবণের মত ভালবাসার গল্প জানেনা এমন লোকের সংখ্যা আমার ধারণা খুব কম আছেন । যদিও গল্পটি অনেকের জানা তবুও গল্পটির সারসংক্ষেপ বর্ণনা করছি।

এক রাজা তার অত্যন্ত প্রিয় তিন কন্যাকে একদিন ডেকে জিজ্ঞেস করলেন তোমরা আমাকে কে কেমন ভালবাস একে একে বল, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে।
রাজার বড় মেয়ে বলল আমি তোমাকে মধুর মত ভালবাসি বাবা।
দ্বিতীয় মেয়ে বলল আমি তোমাকে চিনির মত ভালবাসি বাবা ।
ছোট মেয়ে বলল আমি তোমাকে লবণের মত ভালবাসি বাবা ।
বড় এবং মেঝ মেয়ের কথায় রাজা সন্তুষ্ট হলেও সবচেয়ে আদরের ছোট মেয়ের কথায় রাজা খুবই ব্যথিত হলেন। রাজা বড় এবং মেঝ মেয়েকে খুব ধুমধামে রাজপুত্তুরদের সাথে বিয়ে দিলেন, আর লবণের মত ভালবাসে বলার অপরাধে ক্ষিপ্ত হয়ে ছোট মেয়েকে এক কাঠুরিয়ার সাথে বিয়ে দিয়ে বনবাসে পাঠিয়ে দিলেন।

কিছুদিন পর রাজা ঠিক করলেন তিনি তার মেয়েদের সাথে দেখা করবেন ।
রাজা প্রথমে রাজ পরিবারে বিয়ে দেওয়া বড় আর মেঝ মেয়ের বাড়িতে গিয়ে মনোমত উত্তম আপ্যায়ন পেলেন না। মেয়েরা বাবার জন্য যা কিছু রান্নাবান্না করেছেন সব কিছুতেই মধু এবং চিনির পরিমাণ বেশি বেশি ছিল ।
লবণ ছাড়া অত্যধিক মিষ্টি জাতীয় রান্না করা খাবার খেয়ে রাজার মনটা তেতো হয়ে উঠে। বড় দুই মেয়ের প্রতি ত্যক্ত বিরক্ত রাজা এবার ছুটে গেলেন ছোট মেয়ের বাড়িতে। গরিব কাঠুরের ঘরের মেয়ে বাবাকে পেয়ে খুব খুশি হয়ে গেল।
পরম যত্ন সহকারে পরিমাণ মত লবণ দিয়ে বাবার জন্য সুস্বাদু খাবার রান্না করে বাবার সামনে দিলেন। দীর্ঘদিন পর ক্ষুধার্ত রাজা তৃপ্তি সহকারে ছোট মেয়ের ঘরে পেট পুরে খেতে পেরে নিজের জীবন ধন্য হয়ে গেল। রাজা তার ভুল বুঝতে পারলেন। অনুতপ্ত হয়ে ছোট মেয়ের কাছে ক্ষমা চাইলেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বহুল আলোচিত পণ্য পেঁয়াজ নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক, ইউটিউব, পত্র পত্রিকা, ইলেকট্রনিক্সস মিডিয়ায় সর্বাধিক ব্যঙ্গ বিদ্রুপ, কৌতুকপ্রদ নাটক নাটিকা, হাস্যরস সৃষ্টিকারী ট্রল, গান, কবিতা, ছড়া, এমনকি কথামালার ফুলঝরি, বিশেষজ্ঞ মতামত দেশের সর্বোচ্চ মহল থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন পর্যায়ে যেই ভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে নিকট অতীতে অন্য কোন বিষয় নিয়ে এত মাতামাতি চোখে পড়েনি।
পেঁয়াজের ঝাঁজে অনেকের চোখে পানি এলেও কারো কারো ঠোঁটে চিকন হাসি ফুটেছে। কোটি মানুষের পকেটে ফাঁকা হলেও অনেকের পকেট ফুলেফুঁপে উঠেছে। শত দুঃখ বেদনার মাঝেও কারো কারো রসাত্মক কথাবার্তায় মানুষ প্রাণ ভরে উপভোগ করেছেন। পেঁয়াজ ছাড়া রান্না করার পরামর্শ বা নিজে পেঁয়াজ ছাড়া রান্না করার খোশগল্প বিভিন্ন সভা সেমিনারের বক্তব্য বা কারও কারও পেঁয়াজ ছাড়া বিশ প্রকারের রান্নার অভিজ্ঞতার বয়ান শুনে শতকষ্টেও অনেককে অট্টহাসি হাসতে দেখেছি।
সরকারের অধিকাংশ দায়িত্বশীল লোকজনের দায়িত্বহীন উপদেশ মানুষকে ব্যথিত করতে দেখেছি।
সমস্যার দ্রুত সমাধানের চেয়ে পেঁয়াজ বিহীন রান্না করার পরামর্শ সম্বলিত জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় কান জ্বালা পালা হওয়ার অবস্থা।
পেঁয়াজের ঝাঁজ নিয়ে আলোচনা সমালোচনার মধ্যে গতকাল নতুন করে আলোচনার শীর্ষ ছিল হঠাৎ লবণের মূল্যবৃদ্ধি। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সারা দেশে লবণ ক্রয়ের হিড়িক পড়ে যায়। পেঁয়াজের মত হঠাৎ লবণের মূল্যবৃদ্ধির কথা শুনে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন ।
অতীতের মত যে কোন ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে গুজব বলে দাবি করার পুরনো রেওয়াজ গতকালও দেখা গিয়েছে।
বর্তমান সময়ে কোনটা গুজব আর কোনটা গুজব নয় তা বুঝা বড় মুশকিল। পেঁয়াজের সংকট যখন দেখা দিয়েছিল, বাজারে পেঁয়াজের দাম হু হু করে বেড়ে চলছিল তখনো সরকারের দায়িত্বশীল অনেকেই গুজব বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। দেশে পেঁয়াজের কোন সংকট নাই বলে সরকারের পক্ষ থেকে জনসাধারণকে আশ্বস্ত করার শত চেষ্টা করতে দেখা গিয়েছে।
সংকট যখন গভীর থেকে গভীরে চলে গিয়েছে তখন পেঁয়াজ ছাড়া রান্নার রেসিপির নতুন নতুন বয়ান বিশেষজ্ঞরা দিতে শুরু করেন। কে কখন পেঁয়াজ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন বা পেঁয়াজের পুষ্টিগুণ নিয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত প্রদান করতে শুরু করেন।
পেঁয়াজের ন্যায় লবণের সংকট মোকাবিলায় লবণ ছাড়া রান্নার নতুন রেসিপির আশঙ্কায় মানুষ হুমড়ি খেয়ে উচ্চ মূল্যে লবণ মজুত করতে উঠে পড়ে লেগে যায়। মারার উপর খাড়া ঘা বেশি দামে বেশি বেশি লবণ কিনতে গিয়ে অনেকেই জরিমানা দিতে হয়েছে।

আশাকরি পেঁয়াজ ছাড়া রান্নার উদ্যোক্তারা ভবিষ্যতে লবণ ছাড়া রান্নার উপদেশ দান থেকে দয়া করে বিরত থাকবেন।