১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন’স ডে ! ভ্যালেন্টাইন শব্দের আভিধানিক কোন অর্থ নাই ।ভ্যালেন্টাইন শব্দের অর্থও ভালবাসা নয় ! সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স নামক একজন ধর্ম যাজকের নাম অনুসারে দিবসটির নামকরন করা হয়েছে মাত্র । সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ছিলেন একাধারে একজন বিখ্যাত ধর্ম যাজক এবং আধ্যাত্মিক ক্ষমতা সম্পূর্ন একজন চিকিৎসক। তিনি এমনই ব্যক্তি, খ্রিস্টান গীর্জা কর্তৃক যাকে তার গুণাবলী বা ভালো কাজের জন্য পবিত্র সত্তা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।এই মহান ধর্মযাজকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন-ই এ দিনটি উদযাপনের মূল উদ্দেশ্য।কথিত আছে যে তিনি ভালোবাসার জন্য আত্মদান করেছেন ! অবার এই ব্যাপারে অনেকেই ভিন্নমত পোষণ করেন । মূলত তাকে খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচারের অভিযোগে তৎকালীন রোম সম্রাট কারাবন্দী করেন । সেখানেই তিনি একজন অন্ধ নারীর চিকিৎসা এবং তার প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়েন ।
আশ্চর্যজনক হলোও সত্যি বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও দিনটিকে ” বিশ্ব ভালবাসা” দিবস নামে অবিহিত করা হয় না !
পশ্চিমা বিশ্ব বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভ্যালেন্টাইন’স -ডে নামেই অবিহিত করা হয় । দিবসটি উপলক্ষে মানুষ তার ভালোবাসার মানুষকে ফুল, চিঠি,কার্ড, গহনা প্রভৃতি উপহার প্রদান করে দিনটি উদযাপন করে । আমি আমার দশ বছরের ইউরোপের জীবনে কখনো দেখিনি ভ্যালেন্টাইন’স-ডেকে কেন্দ্রকরে অশ্লীল উচ্ছৃঙ্খল বেলাল্লাপনা জীবনের সাথে প্রেমিক প্রমিকাকে গা ভাসিয়ে দিতে।
ভ্যালেন্টাইন’স ডে আন্তজাতিক ভাবে স্বীকৃত কোন বিশেষ দিবসও নয়। জাতিসংঘ স্বীকৃত অনেক দিবস আমরা যথাযোগ্য মর্যদার সাথে পালন করে থাকি । বিশ্ব নারী দিবস,বিশ্ব প্রবীণ দিবস ,বিশ্ব জন সংখ্যা দিবস, সহ অনেক অনেক দিবস পালন করে থাকি । আবার জাতীয় ভাবে স্বাধীনতা দিবস .বিজয় দিবস মহান ভাষা দিবস পালন করি ।
২১শে ফেব্রুয়ারি আমাদের মহান ভাষা দিবস । বাঙলা ভাষাকে রাষ্ট ভাষা করার দাবীতে রফিক বরকত জব্বর সহ অনেকেই শহীদ হয়েছেন । শহীদের বুকের তাজারক্তে রঞ্জিত ২১শে ফেব্রুয়ারিকে স্মরণ করতে এবং শহীদের প্রতি সন্মান প্রদর্শন করতে আমরা শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে থাকি ।
১৯৫২ সাল থেকে আমরা রাত ১২টা ১ মিনিটে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং সকালে খালি পায়ে প্রভাত ফেরি করে থাকি । ঢাকাস্থ বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তাবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন এবং সর্বস্তরের জনগণ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন।
২০১০ সালে জাতিসংঘ ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দেয় । স্বীকৃতি লাভের পর থেকে পৃথিবীর অনেক দেশেই আন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবসটি সভা সেমিনারের মধ্যে দিয়ে যথাযোগ্য মর্যদার সহিত পালিত হয়ে আসছে । কিন্তু কোথাও শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ বা সাকালে খালি পায়ে প্রভাত ফেরি অনুষ্ঠিত হয় না ।
২১শে ফেব্রুয়ারি আমাদের শহীদ দিবস আমরা আমাদের মত করে পালন করি ।দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শহীদ মিনার নির্মান করে আমরা শ্রদ্ধা নিবেদন করি । শহীদ মিনারে ফুল দেওয় নিয়ে আমাদের দেশে ধর্মান্ধ কিছু মানুষের আপত্তি থাকলেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জণগনের সমর্থন থাকায় আমরা নির্বিঘ্নে শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে আসছি ।
জাতিসংঘ স্বীকৃত একটি আন্তজাতিক দিবেসে যেখানে পশ্চমা বিশ্ব বা ইউরোপের কোথাও শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক বা প্রভাত ফেরি করার প্রচলন নাই সেখানে আমরা কেন পশ্চিমা সংস্কৃতির ভাযলেন্টাইন’স-ডে পালন নিয়ে এত মাতামাতি করছি । অনেকেই বিশ্বায়নের ধুয়া তুলছেন ! বিশ্বায়ন কি শুধু আমাদের দেশের জন্য প্রযোজ্য ?
পশ্চিমা সংস্কৃতির সাথে আমাদের সংস্কৃতির দূরত্ব আকাশ পাতাল ।
প্রতিটি জাতির কিছু নিজস্ব সংস্কৃতি থাকে যা তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় বিশ্বের কাছে। এসব সংস্কৃতিই বলে দেয় এক একটি জাতির নিজস্বতা। আমরা আমাদের সংস্কৃতি ভুলে পশ্চিমা সংস্কৃতিতে এত বেশি মগ্ন হয়ে গেছি যে আজ বাঙালি জাতির নিজস্বতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। পহেলা বৈশাখ, নবান্ন উৎসব, পিঠা মেলা পহেলা ফাগুন বা বসন্ত উৎসব এগুলো ছিল আবহমান বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি। ১৪ ফেব্রুয়ারি বা ভ্যালেন্টাইন ডে যা আধৌ আমাদের সংস্কৃতি নয়। অনেকেই বলবেন এটা আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব। নিজের অস্তিত্ব ভুলে পশ্চিমা সংস্কৃতির নামে বেহায়াপনার নাম আকাশ সংস্কৃতি হতে পারেনা এর নাম অপসংস্কৃতি। পশ্চিমারা আমাদের সংস্কৃতি কখনো চর্চা করে না ।
আমারা কেন পশ্চিমা সংস্কৃতিকে অনুকরণ করবো ? আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে যদি আমরা জানতে চাই নবান্ন উৎসব বা পিঠা উৎসব কি তখন তারা অবাক দৃষ্টিতে তাকাবে আর বলবে এ আবার কি!!! অথচ এরাই রোজ ডে, হাগ ডে, টেডি ডে ফাদার্স্ ডে মাদার্স্ ডে, ভ্যালেন্টাই ডে কিংবা আরো হাজারো পশ্চিমা সংস্কৃতির নাম বলতে পারবে অবলিলায়। এরা জানেই না যে বাঙালিরও নিজস্ব কিছু সংস্কৃতি আছে, আছে ঐতিহ্য যা তাদের আলাদা করেছে অন্য জাতির কাছ থেকে, দিয়েছে নিজস্ব পরিচয়। এ ব্যর্থতা কার বা কাদের ?? হয়ত এটি আমি, আপনি কিংবা আমাদের ব্যর্থতা। আমরা পারিনি আমাদের সংস্কৃতিকে এ প্রজন্মের কাছে পৌছে দিতে।, পারিনি চর্চার মাধ্যমে তা তাদের কাছে আকর্ষনীয় করে তুলতে।
পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে বিপথগামী প্রজন্ম রক্ষা পাক নিজস্ব সংস্কৃতি পালনের মধ্য দিয়ে। আর এই সংস্কৃতি রক্ষার যাত্রা শুরু হউক আপনার আমার হাত ধরেই। মনে রাখবেন আপনি আমি আমরাই কিন্তু এক এক খন্ড বাংলাদেশ।